Menu |||

বাঙালির স্বাধীনতা আন্দোলনের মহাকাব্য

মার্চ স্বাধীনতাকামী বাঙালির জীবনে স্বাধীকার অর্জনের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামমুখর গৌরবদীপ্ত মাস। মার্চ হলো পাকিস্তানিদের শাসন ও ঔপনিবেশিক শোষণ এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ, স্বাধীকারের সংগ্রামে উজ্জীবনী প্রেরণাদায়ী বীজমন্ত্র এবং পাকিস্তানি নির্যাতন ও বৈষম্যের কবল থেকে দেশকে মুক্ত করার জন্য বাঙালি জাতির মরণপণ সংগ্রাম এর মহাকাব্য। মার্চ মুক্তিকামী জনগণের প্রাণের স্পন্দনে চেতনার বহ্নিশিখায় এক নবজাগরণ। মার্চ মাসে জন্মেছিলেন বাংলার অবিসংবাদিত সিংহপুরুষ শেখ মুজিবুর রহমান। মা-বাবার আদরের ‘খোকা’ নামের শিশুটি হামাগুড়ি দিয়ে বেড়ে ওঠে। টগবগে যৌবনে বাঙালি জাতির নিজস্ব পরিচয় ও ঠিকানা খুঁজতে নিজেকে উৎসর্গ করেছেন। দেশমাতৃকার জন্য নিজের জীবনের বিনিময়ে হলেও অর্জন করতে চেয়েছেন একটি সার্বভৌম ভূখণ্ড। ১৯৪০ থেকে ১৯৭৫ এর ১৪ই আগস্ট পর্যন্ত মাতৃভূমি ও মানুষের কল্যাণে মুক্তিসংগ্রামের একমাত্র পথ প্রদর্শক হয়ে জীবনকে উৎসর্গ করেছেন বীরত্ব, সাহস ও তেজস্বিতার স্বকীয় আলোকছটায়। ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম, ভাষা আন্দোলনের পথধরে গণতন্ত্র ও বাঙালির আজন্ম লালিত অধিকার আদায়ের দাবীতে ৬ দফা, ৭০ এর নির্বাচনে নিরংকুশ বিজয় ও শাষক গোষ্ঠীর ক্ষমতা হস্তান্তরে অস্বীকৃতি, সামরিক জান্তার নিষ্পেষণ, হত্যা, নির্যাতন এর বিরুদ্ধে জাতির ম্যান্ডেট নিয়ে একাত্তরের অগ্নিঝরা ৭ মার্চে রেসকোর্স ময়দানে বজ্রকণ্ঠে স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন – এবারের সংগ্রাম, আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে মরণপণ সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার যে উদাত্ত আহ্বান বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠ থেকে উচ্চারিত হয়েছিল- তা আজও বাঙালির ধমনিতে শিহরণ জাগায়। ৭ মার্চে বাঙালির বুকে স্বাধীনতার বীজমন্ত্র বোনা হয়ে যায়। তিনি উদাত্ত কণ্ঠে আহ্বান জানিয়েছিলেন, ‘যার যা আছে, তা-ই নিয়ে ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। তাঁর ঐতিহাসিক আহ্বানে বাঙালি জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন স্বাধীনতাই আমাদের লক্ষ্য। শোষিত বঞ্চিত বাঙালিকে স্বাধীনতা সংগ্রামে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে উজ্জীবিত করেছিলেন। ৭ মার্চের ভাষণ ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের টার্নিং পয়েন্ট। বঙ্গবন্ধুর তেজোদীপ্ত ভাষণ বাঙালির চেতনায় অগ্নিস্ফুলিঙ্গ সৃষ্টি করেছিল এবং জাতি, ধর্ম, দলমত নির্বিশেষে ঐক্যের পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ করেছিল। যে ভাষণের যাদুকরী মোহনীয় শক্তির উদ্দামতা ছড়িয়ে পড়েছিল সারা বাংলায় বাঙালির প্রতিটি শিরা উপশিরায়। বঙ্গবন্ধুর রেসকোর্স ময়দানের ঐতিহাসিক ভাষণ বিশ্ব ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ আব্রাহাম লিংকনের গেটিসবার্গে প্রদত্ত ভাষণের চেয়ে অনেক বেশি প্রাজ্ঞতার পরিচয় বহন করে। অনেক রাষ্টবিজ্ঞানী বলেছেন আব্রাহাম লিংকনের প্রদত্ত ভাষণটি ছিল পূর্বপরিকল্পিত লিখিত ভাষণ, প্রকৃতপক্ষে শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণটি ছিল তাৎক্ষণিক এবং অলিখিত। সে হিসাবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণটি আব্রাহাম লিংকনের ভাষণটিকেও ছাপিয়ে গেছে। তাই বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি যুগোত্তীর্ণ। এই ভাষণ নিপীড়িত, লাঞ্ছিত স্বাধীনতাকামী মানুষের প্রেরণা ও উদ্দীপনা। বিশ্ব-সম্প্রদায় বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ অত্যন্ত গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছিল। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম নিউজউইক সাময়িকীর বিখ্যাত রিপোর্ট এ বঙ্গবন্ধুকে “পোয়েট অব পলিটিকস হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণকে একটি যুগান্তকারী দিকনির্দেশনামূলক ভাষণ হিসাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে। ১৯৭৪ সালে শান্তিতে নোবেল বিজয়ী শন ভ্যাকব্রাইড বলেছেন শেখ মুজিবুর রহমান বুঝতে পেরেছিলেন, কেবল ভৌগোলিক স্বাধীনতাই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন মানুষের মুক্তি। বেঁচে থাকার স্বাধীনতা, সাম্য ও সম্পদের বৈষম্য দূর করাই স্বাধীনতার সমার্থ। আর এ সত্যের প্রকাশ ঘটে ৭ মার্চের ভাষণে। অর্থনীতিতে নোবেল বিজয়ী অমর্ত্য সেন বলেছেন বঙ্গবন্ধু ছিলেন মানব জাতির পদ প্রদর্শক। তাঁর সাবলীল চিন্তাধারার সঠিক মূল্য শুধু বাংলাদেশ নয় সমস্ত পৃথিবীও স্বীকার করবে। কিউবার অবিসংবাদিত নেতা ফিদেল ক্যাস্ট্রো বলেছেন ৭ মার্চের শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ শুধুমাত্র ভাষণ নয়, এটি একটি অনন্য রণকৌশলের দলিল। এ ভাষণ শুধু বাংলাদেশের মানুষের জন্য নয়, সারা বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের অনুপ্রেরণা।
বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামমুখর জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জন একটি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের জন্ম। অধিকার, স্বায়ত্তশাসন ও গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর লক্ষ্য ছিল এদেশের মানুষের কল্যাণ সাধন এবং স্বাধীন ও মুক্তির লক্ষ্যে তাদের চালিত করা। পর্যায়ক্রমে বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতির মনে সূর্যের আলোর প্রদীপ্ত শিখা প্রজ্বলিত করেছেন, জাতিকে করেছেন আত্মসচেতন, জাগিয়েছেন বাঙালি জাতীয়তাবাদের বোধশক্তি। বাঙালি জাতিকে একটি চেতনায়, একটি ভাবধারায় ও একটি আকাঙক্ষায় তিনি ঐক্যবদ্ধ করেছেন। পাকিস্তানি জান্তার সব রকমের ষড়যন্ত্র বাতাসে উড়িয়ে দিয়ে বঙ্গবন্ধু এ দেশের সর্বশ্রেণির মানুষের প্রাণের মানুষে পরিণত হন। তাঁর কণ্ঠের গভীরতায় উচ্চারিত হয়েছিল ‘আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি, যতদিন একজন বাঙালি বেঁচে থাকবে, ততদিন তারা অর্জিত স্বাধীনতা বিপন্ন হতে দেবে না। বাঙালিকে পরাধীন রাখতে পারে এমন কোনো শক্তি পৃথিবীতে আর নাই।’
৭ মার্চের ভাষণের পর পরই শুরু হয়ে যায় স্বাধীনতাকামী বাঙালিদের খণ্ড খণ্ড যুদ্ধ। যার যা আছে তাই নিয়ে বাংলার সর্বত্র প্রতিরোধ গড়ে তুললো। আর পশ্চিমা নরপিশাচের দল শুরু করলো হত্যাযজ্ঞ। অবশেষে ২৫ মার্চ কালরাত্রিতে পৃথিবীর সকল মানবতাকে পদদলিত করে নিরীহ নিরস্ত্র ঘুমন্ত বাঙালির উপর পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী শুরু করে ‘অপারেশন সার্চ লাইট’ নামের পৃথিবীর সবচেয়ে নারকীয় বর্বরোচিত গণহত্যাযজ্ঞ। পৃথিবীর ইতিহাসে কুখ্যাত এক জেনোসাইডের নাম “অপারেশন সার্চলাইট”। এটা ছিল স্মরণকালের পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কর্তৃক পরিচালিত পরিকল্পিত গণহত্যা, যার মাধ্যমে তারা ১৯৭১ এর মার্চ ও এর পূর্ববর্তী সময়ে সংঘটিত বাঙালির আন্দোলনকে দমন করতে চেয়েছিল। এই গণহত্যা ছিল পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের আদেশে পরিচালিত, যা ১৯৭০ এর নভেম্বরে সংঘটিত “অপারেশন ব্লিটজ এর পরবর্তী অনুষঙ্গ। পাকিস্তানি পরিকল্পনাকারিদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, “অপারেশন সার্চলাইট” এর মূল লক্ষ্য ছিল আওয়ামী লীগের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং সারা পূর্বপাকিস্তানে একযোগে অপারেশন শুরু করা, সর্বোচ্চ সংখ্যক রাজনৈতিক ও ছাত্র সংগঠনের নেতা, সাংস্কৃতিক সংগঠনের সথে জড়িত ব্যক্তিবর্গ এবং শিক্ষকদের গ্রেফতার করা, সেনানিবাসকে সুরক্ষিত রাখা, ঢাকায় অপারেশন ১০০% সফল হওয়া, টেলিফোন, টেলিভিশন, রেডিও ও টেলিগ্রাফ সহ সকল অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করে দেয়া, সকল পূর্বপাকিস্তানি (বাঙালি) সৈন্যদলকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ কেড়ে নিয়ে নিস্ক্রিয় করে দেয়া, আওয়ামী লীগের মনে ভুল ধারণা সৃষ্টি করে তাদের ব্যস্ত রাখার জন্য ইয়াহিয়া খান আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার অভিনয় করবেন। ঢাকা, খুলনা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, যশোর, রাজশাহী, রংপুর, সৈয়দপুর এবং সিলেট এ পূর্ব নির্ধারিত আক্রমণাতœক অপারেশন পরিচালনা করা এবং পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্যদের সমাবেশ জোরদার করেছিল।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্য রাতে শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হন। গ্রেপ্তার হবার একটু আগে ২৫ শে মার্চ রাত ১২ টার পর (অর্থাৎ, ২৬ শে মার্চের প্রথম প্রহরে) তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেন যা ওয়ারলেস বার্তার মাধ্যমে চট্টগ্রামে আওয়ামীলীগের নেতৃস্থানীয় নেতৃবৃন্দের কাছে পৌঁছে যায়। ঘোষণাটি নিম্নরূপ : “এটাই হয়ত আমার শেষ বার্তা, আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। আমি বাংলাদেশের মানুষকে আহ্বান জানাই, আপনারা যেখানেই থাকুন, আপনাদের সর্বস্ব দিয়ে দখলদার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত প্রতিরোধ চালিয়ে যান। বাংলাদেশের মাটি থেকে সর্বশেষ পাকিস্তানি সৈন্যটিকে উৎখাত করা এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের আগ পর্যন্ত আপনাদের যুদ্ধ অব্যাহত থাকুক। ২৬ শে মার্চ বেলাল মোহাম্মদ, আবুল কাসেমসহ চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্রের কয়েক’জন কর্মকর্তা ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা এম এ হান্নানের মাধ্যমে প্রথম শেখ মুজিব এর স্বাধীনতার ঘোষণাটি প্রচার করেন। পরে চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর হয়ে সেনাবাহিনীর বাঙালি অফিসার মেজর জিয়াউর রহমান আমাদের স্বাধীনতার ঘোষণা পত্র পাঠ করেন।
এই ঘোষণার মধ্য আনুষ্ঠানিকভাবে বাঙালি শুরু করে মরণপণ স্বাধীনতা সংগ্রাম মুক্তিকামী বাঙালি জাতি উদ্দীপ্ত হন। জেগে উঠে বাঙালি জাতি। যা নয় মাস স্থায়ী হয়। নয় মাসের সেই রক্তঝরা সংগ্রামের আমরা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি জাতির সেসব শ্রেষ্ঠ সন্তানকে যাদের আত্মত্যাগে আজকের বাংলাদেশ। সুদীর্ঘ নয় মাসের কঠোর সংগ্রামে বাংলার আপামর জনগণ ছিনিয়ে আনে ‘স্বাধীনতা’- আত্মত্যাগ আর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত অমূল্য সম্পদ –
প্রিয় স্বাধীনতা, স্বাধীন পতাকা, স্বাধীন মানচিত্র। বিশ্ব মানচিত্রে স্বাধীন জাতি হিসেবে স্থান করে নিতে জাতির অবিসংবাদিত নেতা, রাজনীতির মহানায়ক, বাংলাদেশের স্থপতি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একটি অবিস্মরণীয় ও যুগান্তকারী নাম হয়েছিলেন। চলার পথ যতই বন্ধুর হোক না কেন বঙ্গবন্ধু সকল বাধা-প্রতিবন্ধকতাকে উপেক্ষা করে ইতিহাসের মহাসড়কের পথ ধরে নিজস্ব পথ তৈরি করে এগিয়ে অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির ধারক বাহক হয়ে এগিয়ে গেছেন। বঙ্গবন্ধুর লক্ষ্য ছিল এদেশের মানুষের কল্যাণ সাধন এবং স্বাধীনতার অধিকার, স্বায়ত্তশাসন ও গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলনে বাঙালি জাতিকে একটি চেতনায় ঐক্যবদ্ধ করা । পর্যায়ক্রমে বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতির মনে সূর্যের আলোর প্রদীপ্ত শিখা প্রজ্জ্বলিত করেছেন, জাতিকে করেছেন আত্মসচেতন, জাগিয়েছেন বাঙালি জাতীয়তাবাদের বোধশক্তি। বঙ্গবন্ধুর দেশপ্রেম, সত্যনিষ্ঠা, আপসহীন মনোভাব তাঁকে করে তুলেছিল অসাম্প্রদায়িক ও মানবতাবাদী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বে এবং বিশ্বরাজনীতিতে একজন প্রজ্ঞাবান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছিলেন। তিনি ইতিহাস সৃষ্টি করে ইতিহাসের পাতায় চিরভাস্বর , অমর হয়ে থাকবেন এ বাংলার বুকে ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শ, ত্যাগ, দূরদর্শিতা এবং অকুতোভয় আপোসহীন নেতৃত্বে দেশ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর কবল থেকে মুক্ত হয়েছিল। বাঙালি জাতি পেয়েছিল হাজার বছরের আকাঙিক্ষত প্রিয় স্বাধীনতা, স্বাধীন পতাকা, স্বাধীন মানচিত্র। শেখ মুজিবের অপরিসীম আত্মত্যাগের ফসলই হচ্ছে স্বাধীন বাংলাদেশ। শেখ মুজিব ও বাংলাদেশ একে অপরের অবিচ্ছেদ্য অংশ। একটিকে বাদ দিয়ে অপরটিকে কল্পনা করা যায় না।’ মুজিবের তেজোদীপ্ত মনোভাবের কাছে স্বৈরাচারী পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠী প্রতিহত হয়েছে। তাই কবি জিল্লুর রহমানের কাব্যিক ছন্দে বলতে হয়- ‘বাংলার মাটিতে তোমার জন্ম বলেই এ মাটি হয়েছে ধন্য, আকাশের কালো মেঘ ভেদ করে এনেছ যে স্বাধীনতা, তুমি আর কেউ নও, বার কোটি বাঙালির স্বপ্নের পুরুষ জাতির জনক শেখ মুজিবর রহমান। আর আমরা বিশ্বের যে কোন প্রান্তে গিয়ে সগৌরবে বলতে পারি আমি বাঙালি, বাংলা আমার দেশ, বাংলা আমার মায়ের ভাষা।’ এই গৌরবগাথা এ ভূখন্ডের হৃদয়ের সম্রাট হয়ে অমর, অজেয় অবিনশ্বর এবং শোষিত, বঞ্চিত, নিপীড়িত ও নির্যাতিত মানুষের মুক্তির ইতিহাসে একজন কিংবদন্তি।
বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলন , মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সৃষ্টির সময়ে আমাদের প্রজন্ম খুবই ভাগ্যবান এবং আমাদের চোখের সামনে বাঙালি জাতির ইতিহাসের নির্মাণ দেখেছি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের সময়ে আমি শৈশবে একাত্তরের সংগ্রামমুখর দিনগুলো দেখেছিলাম। মার্চ এলেই মুক্তিযুদ্ধের অগ্নিঝরা দিনগুলোর স্মৃতি মনকে আবার জাগিয়ে তোলে। পাকহানাদার ও তাদের দোসরদের নিকৃষ্ঠতম কর্মকাণ্ডগুলো ও একাত্তরের ঘটনা প্রবাহ উপলব্ধি করেছিলাম। অনুভুবের সীমাহীন জিজ্ঞাসায় গভীর মৌনতায় স্বাধীনতাসংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের মানে খুঁজতাম। মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলো কিছু প্রত্যক্ষ ঘটনাপ্রবাহ মনের অলিন্দে সংগ্রামী সত্বার চেতনাকে জাগিয়ে তোলে। তখন যদি যুবা হতাম অবশ্যই দেশ মাতৃকার জন্যে মুুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতাম। অবশ্য মুক্তিযোদ্ধারা যখন আমাদের গ্রামে তাদের আস্তানা স্থাপন করেছিল তখন তাদের অস্ত্র, গোলা বারুদ খুটিয়ে খুটিয়ে দেখতাম। শিশু মনে তখন জেগে উঠতো অন্য এক সত্তা যদি মুক্তিযোদ্ধাদের সহযাত্রী হতে পারতাম। বিআইটি (বর্তমানে চুয়েট) তে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আস্তানা স্থাপন করেছিল। আমাদের গ্রাম কদলপুর বিআইটি থেকে ১ থেকে ১ত(১,২) কিলোমিটার দূরে। মুক্তিযুুদ্ধের সময় ঊনসত্তর পাড়া বিদ্যালয়ের পাশেই পাকিস্তানি সামরিক জান্তার দোসর রাজাকার আলবদর, মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ শক্তির উন্মত্ততায় অসংখ্য হিন্দুকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। অনেক হিন্দু জনগোষ্ঠী আমাদের গ্রামে আশ্রয় নিয়েছিল। তাদের পূর্ণ নিরাপত্তার জন্য আমাদের গ্রামের আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সহযোগিতা করেছিল এমনকি আমাদের প্রতিবেশী মুসলমান ভাইয়েরা একাত্ম হয়েছিল।
মুক্তিযুদ্ধের আরেকটি ঘটনার বিবরণ না দিলে আমার শৈশবের স্মৃতিগুলো অপ্রকাশিত থেকে যায়। যুদ্ধকালীন সময়ে কিছুদিনের জন্য আমি আমার মা রাউজানের উরকিরচর ইউনিয়নের আবুরখীল গ্রামে মাসীর বাড়ি চলে যায়। সেখানে একদিন এক আত্মীয়ের বাড়ি থেকে ফিরতে সন্ধ্যায় আবুরখীল অমিতাভ স্কুলের কাছাকাছি মুক্তিযোদ্ধা ও রাজাকারদের সম্মুখ যুদ্ধে আমার দুই দাদাসহ মধ্যখানে পড়ে যায়। প্রচণ্ড গুলিবিনিময় চলছিল। নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য এক গৃহস্থের বাড়ির পাশে পুকুরের পাড় ঘেষে দাদাদের সাথে উপূড় হয়ে শুয়ে থাকি। মাথার ওপর দিয়ে আগুনের ফুলকির মতো গুলি যাচ্ছে। অবিশ্বাস্যভাবে আমরা বেঁচে যায়। কিন্তু ওই রাতে একজন অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধা সম্মুখ সমরে নিহত হন। মুক্তিযুদ্ধের সময় বাবা চাকুরী করতেন ঢাকায়। কোন খোঁজ খবর ছিল না। আমার মা দীর্ঘশ্বাস ফেলতেন এবং বলতেন তোর বাবা কি এই যুদ্ধের ময়দান পেরিয়ে ফিরে আসবে। শৈশবের কোমল হৃদয়ে বাবা হারানোর বেদনায় চোখগুলো ছলছল করে উঠতো। কিন্তু হঠাৎ একদিন ফিরে এলো আমার জন্মদাতা ক্লান্ত, বিধ্বস্থ শরীরে। তার ফিরে আসার কাহিনী অনেক দীর্ঘ। পায়ে হেঁটে দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে বাবা ফিরে এসেছিলো আমাদের মাঝে। এটা গল্প নয়। আমার শৈশবে মনের গহীনে যে প্রত্যক্ষ ঘটনাগুলো ক্যানভাসে আঁকা হয়েছিল আজকের এই ৪৫ তম স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে লেখনীতে প্রকাশ করলাম। জয় বাংলাে াগানে খুব নিবিড়ভাবে আবিষ্ঠ ছিলাম। রেডিওতে শুনতাম যুদ্ধদিনের গান।ে াগানগুলো আওরাতাম- এক মুজিব কারাগারে, লক্ষ মুজিব ঘরে ঘরে। জেলের তালা ভাঙবো, শেখ মুজিবকে আনবো ইত্যাদি ইত্যাদি। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিময় কিছু প্রত্যক্ষ ঘটনার ও স্বাধীনতার ইতিহাসের সাক্ষী হতে পেরে নিজেকে গৌরবান্বিত মনে করছি এবং নিজের চোখে একাত্তর দেখেছি, প্রতিরোধ দেখেছি, সংগ্রাম দেখেছি পাকিস্তানি দস্যুদের নিপীড়ন, হত্যাযজ্ঞ দেখেছি, আলবদর, আলশাসমদের নির্যাতন, লুণ্ঠন দেখেছি এবং একাত্তরে বাঙালি, বাংলা মায়ের দামাল ছেলেদের বিজয় দেখেছি, লাল সবুজের পতাকা দেখেছি। দেখেছি পরম বিস্ময়ে জেগে উঠা বাঙালি জাতিকে। পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে ও অসংখ্য মা বোনের সম্ভ্রম হানি এ যেন রক্তের দামে কেনা স্বাধীনতা।
শীর্ষ যুদ্ধাপরাধী ও মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং কিছু সম্পন্ন হয়েছে। অশুভ শক্তির নিকৃষ্ট ষড়যন্ত্রকে প্রতিরোধ করে ষোল কোটি মানুষের স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশকে রক্ষা করার প্রত্যয়ে জাতিকে আরো তৎপর ও মনোযোগী হতে হবে, করতে হবে ত্যাগ স্বীকার। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় স্বাধীনতার পক্ষের শক্তিকে সদাজাগ্রত থেকে আগামীর পথে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়কে সুদৃঢ় করতে হবে। শুদ্ধ রাজনৈতিক পরিবেশ এ সমৃদ্ধ গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন বঙ্গবন্ধু তনয়া ও গণতন্ত্রের মানসকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা । অর্থনৈতিক মুক্তি ও উন্নয়নের পথে বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে এটাই আমাদের প্রত্যাশা। মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি সশ্রদ্ধ প্রণতি যারা আত্মবলিদানে আমাদের দিয়ে গেছে স্বাধীন মাতৃভূমি যেখানে আমরা সবাই বাঙালি, মায়ের ভাষা বাংলায় কথা বলি। জাতি চিরকাল স্মরণ করবে অকুতোভয় বীর যোদ্ধাদের। ৩০ লাখ শহীদের আত্মদান, অপরিসীম ত্যাগ আর বীরত্বগাঁথা সমুন্নত রাখতে দেশপ্রেমের চেতনায় আত্মমর্যাদাশীল সমৃদ্ধ জাতি হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয়ে আমাদের ইতিহাসের মহাসড়কের পথ ধরে নিজস্ব পথ তৈরি করে এগিয়ে যেতে হবে তবেই শাণিত হবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং সোনালী সূর্যের আলোয় উদ্ভাসিত হবে আমাদের এ প্রিয় স্বদেশ । (সংগৃহীত)
লেখক : প্রাবন্ধিক , কলাম লেখক ও সহকারী রেজিস্ট্রার, বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ।
Facebook Comments Box

সাম্প্রতিক খবর:

কুয়েতে শেষ হলো আকামা বদলের সুযোগ, ২৭ হাজার প্রবাসীর খাত পরিবর্তন

খাদ্য নিরাপত্তা ও নাগরিক সচেতনতা: উন্নত বিশ্বের চেয়ে আমরা ঠিক কতটা পিছিয়ে?

কুয়েতের মরুভূমিতে লাল-সবুজের বিপ্লব

টানা পঞ্চম জয়! কুয়েত সামার লিগের উদ্বোধনী ম্যাচে সিলেট সিক্সার্সের বড় জয়

কুয়েতের আদালতে বাংলাদেশি নাগরিকের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, ভারতীয় নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড বহাল

বিদেশী বিনিয়োগকারীদের ১৫ বছরের দীর্ঘমেয়াদী রেসিডেন্সি দিচ্ছে কুয়েত

কুয়েত প্রবাসী কবি ও সাহিত্যিক সঞ্জীব ভদ্র চন্দন আর নেই, বাংলাদেশ প্রেসক্লাব কুয়েতের শোক প্রকাশ

প্রবাসের গণ্ডি পেরিয়ে এবার জন্মভূমির সেবায় কামাল হোসেন ভূঁইয়া

কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলা ও বিমান চলাচল স্থগিত

রাজনীতির উজ্জ্বল নক্ষত্র তোফায়েল আহমেদ

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



» কুয়েতে জশনে ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) মাহফিল অনুষ্ঠিত

» গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশ কুয়েত কেন্দ্রীয় কমিটির দ্বি-বার্ষিক কাউন্সিল অনুষ্ঠিত

» কুয়েতে শেষ হলো আকামা বদলের সুযোগ, ২৭ হাজার প্রবাসীর খাত পরিবর্তন

» খাদ্য নিরাপত্তা ও নাগরিক সচেতনতা: উন্নত বিশ্বের চেয়ে আমরা ঠিক কতটা পিছিয়ে?

» কুয়েতের মরুভূমিতে লাল-সবুজের বিপ্লব

» কুয়েত গাউছিয়া কমিটি ফাহাহিল শাখার মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়েছে

» টানা পঞ্চম জয়! কুয়েত সামার লিগের উদ্বোধনী ম্যাচে সিলেট সিক্সার্সের বড় জয়

» মৌলভীবাজারে যুক্তরাজ্য প্রবাসী আব্দুল আজিজকে নাগরিক সংবর্ধনা

» কুয়েতের আদালতে বাংলাদেশি নাগরিকের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, ভারতীয় নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড বহাল

» বিদেশী বিনিয়োগকারীদের ১৫ বছরের দীর্ঘমেয়াদী রেসিডেন্সি দিচ্ছে কুয়েত

Agrodristi Media Group

Advertising,Publishing & Distribution Co.

Editor in chief & Agrodristi Media Group’s Director. AH Jubed
Legal adviser. Advocate Musharrof Hussain Setu (Supreme Court,Dhaka)
Editor in chief Health Affairs Dr. Farhana Mobin (Square Hospital, Dhaka)
Social Welfare Editor: Rukshana Islam (Runa)

Head Office

UN Commercial Complex. 1st Floor
Office No.13, Hawally. KUWAIT
Phone. 00965 65535272
Email. agrodristi@gmail.com / agrodristitv@gmail.com

Desing & Developed BY PopularITLtd.Com
,

বাঙালির স্বাধীনতা আন্দোলনের মহাকাব্য

মার্চ স্বাধীনতাকামী বাঙালির জীবনে স্বাধীকার অর্জনের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামমুখর গৌরবদীপ্ত মাস। মার্চ হলো পাকিস্তানিদের শাসন ও ঔপনিবেশিক শোষণ এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ, স্বাধীকারের সংগ্রামে উজ্জীবনী প্রেরণাদায়ী বীজমন্ত্র এবং পাকিস্তানি নির্যাতন ও বৈষম্যের কবল থেকে দেশকে মুক্ত করার জন্য বাঙালি জাতির মরণপণ সংগ্রাম এর মহাকাব্য। মার্চ মুক্তিকামী জনগণের প্রাণের স্পন্দনে চেতনার বহ্নিশিখায় এক নবজাগরণ। মার্চ মাসে জন্মেছিলেন বাংলার অবিসংবাদিত সিংহপুরুষ শেখ মুজিবুর রহমান। মা-বাবার আদরের ‘খোকা’ নামের শিশুটি হামাগুড়ি দিয়ে বেড়ে ওঠে। টগবগে যৌবনে বাঙালি জাতির নিজস্ব পরিচয় ও ঠিকানা খুঁজতে নিজেকে উৎসর্গ করেছেন। দেশমাতৃকার জন্য নিজের জীবনের বিনিময়ে হলেও অর্জন করতে চেয়েছেন একটি সার্বভৌম ভূখণ্ড। ১৯৪০ থেকে ১৯৭৫ এর ১৪ই আগস্ট পর্যন্ত মাতৃভূমি ও মানুষের কল্যাণে মুক্তিসংগ্রামের একমাত্র পথ প্রদর্শক হয়ে জীবনকে উৎসর্গ করেছেন বীরত্ব, সাহস ও তেজস্বিতার স্বকীয় আলোকছটায়। ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম, ভাষা আন্দোলনের পথধরে গণতন্ত্র ও বাঙালির আজন্ম লালিত অধিকার আদায়ের দাবীতে ৬ দফা, ৭০ এর নির্বাচনে নিরংকুশ বিজয় ও শাষক গোষ্ঠীর ক্ষমতা হস্তান্তরে অস্বীকৃতি, সামরিক জান্তার নিষ্পেষণ, হত্যা, নির্যাতন এর বিরুদ্ধে জাতির ম্যান্ডেট নিয়ে একাত্তরের অগ্নিঝরা ৭ মার্চে রেসকোর্স ময়দানে বজ্রকণ্ঠে স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন – এবারের সংগ্রাম, আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে মরণপণ সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার যে উদাত্ত আহ্বান বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠ থেকে উচ্চারিত হয়েছিল- তা আজও বাঙালির ধমনিতে শিহরণ জাগায়। ৭ মার্চে বাঙালির বুকে স্বাধীনতার বীজমন্ত্র বোনা হয়ে যায়। তিনি উদাত্ত কণ্ঠে আহ্বান জানিয়েছিলেন, ‘যার যা আছে, তা-ই নিয়ে ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। তাঁর ঐতিহাসিক আহ্বানে বাঙালি জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন স্বাধীনতাই আমাদের লক্ষ্য। শোষিত বঞ্চিত বাঙালিকে স্বাধীনতা সংগ্রামে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে উজ্জীবিত করেছিলেন। ৭ মার্চের ভাষণ ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের টার্নিং পয়েন্ট। বঙ্গবন্ধুর তেজোদীপ্ত ভাষণ বাঙালির চেতনায় অগ্নিস্ফুলিঙ্গ সৃষ্টি করেছিল এবং জাতি, ধর্ম, দলমত নির্বিশেষে ঐক্যের পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ করেছিল। যে ভাষণের যাদুকরী মোহনীয় শক্তির উদ্দামতা ছড়িয়ে পড়েছিল সারা বাংলায় বাঙালির প্রতিটি শিরা উপশিরায়। বঙ্গবন্ধুর রেসকোর্স ময়দানের ঐতিহাসিক ভাষণ বিশ্ব ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ আব্রাহাম লিংকনের গেটিসবার্গে প্রদত্ত ভাষণের চেয়ে অনেক বেশি প্রাজ্ঞতার পরিচয় বহন করে। অনেক রাষ্টবিজ্ঞানী বলেছেন আব্রাহাম লিংকনের প্রদত্ত ভাষণটি ছিল পূর্বপরিকল্পিত লিখিত ভাষণ, প্রকৃতপক্ষে শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণটি ছিল তাৎক্ষণিক এবং অলিখিত। সে হিসাবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণটি আব্রাহাম লিংকনের ভাষণটিকেও ছাপিয়ে গেছে। তাই বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি যুগোত্তীর্ণ। এই ভাষণ নিপীড়িত, লাঞ্ছিত স্বাধীনতাকামী মানুষের প্রেরণা ও উদ্দীপনা। বিশ্ব-সম্প্রদায় বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ অত্যন্ত গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছিল। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম নিউজউইক সাময়িকীর বিখ্যাত রিপোর্ট এ বঙ্গবন্ধুকে “পোয়েট অব পলিটিকস হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণকে একটি যুগান্তকারী দিকনির্দেশনামূলক ভাষণ হিসাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে। ১৯৭৪ সালে শান্তিতে নোবেল বিজয়ী শন ভ্যাকব্রাইড বলেছেন শেখ মুজিবুর রহমান বুঝতে পেরেছিলেন, কেবল ভৌগোলিক স্বাধীনতাই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন মানুষের মুক্তি। বেঁচে থাকার স্বাধীনতা, সাম্য ও সম্পদের বৈষম্য দূর করাই স্বাধীনতার সমার্থ। আর এ সত্যের প্রকাশ ঘটে ৭ মার্চের ভাষণে। অর্থনীতিতে নোবেল বিজয়ী অমর্ত্য সেন বলেছেন বঙ্গবন্ধু ছিলেন মানব জাতির পদ প্রদর্শক। তাঁর সাবলীল চিন্তাধারার সঠিক মূল্য শুধু বাংলাদেশ নয় সমস্ত পৃথিবীও স্বীকার করবে। কিউবার অবিসংবাদিত নেতা ফিদেল ক্যাস্ট্রো বলেছেন ৭ মার্চের শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ শুধুমাত্র ভাষণ নয়, এটি একটি অনন্য রণকৌশলের দলিল। এ ভাষণ শুধু বাংলাদেশের মানুষের জন্য নয়, সারা বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের অনুপ্রেরণা।
বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামমুখর জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জন একটি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের জন্ম। অধিকার, স্বায়ত্তশাসন ও গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর লক্ষ্য ছিল এদেশের মানুষের কল্যাণ সাধন এবং স্বাধীন ও মুক্তির লক্ষ্যে তাদের চালিত করা। পর্যায়ক্রমে বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতির মনে সূর্যের আলোর প্রদীপ্ত শিখা প্রজ্বলিত করেছেন, জাতিকে করেছেন আত্মসচেতন, জাগিয়েছেন বাঙালি জাতীয়তাবাদের বোধশক্তি। বাঙালি জাতিকে একটি চেতনায়, একটি ভাবধারায় ও একটি আকাঙক্ষায় তিনি ঐক্যবদ্ধ করেছেন। পাকিস্তানি জান্তার সব রকমের ষড়যন্ত্র বাতাসে উড়িয়ে দিয়ে বঙ্গবন্ধু এ দেশের সর্বশ্রেণির মানুষের প্রাণের মানুষে পরিণত হন। তাঁর কণ্ঠের গভীরতায় উচ্চারিত হয়েছিল ‘আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি, যতদিন একজন বাঙালি বেঁচে থাকবে, ততদিন তারা অর্জিত স্বাধীনতা বিপন্ন হতে দেবে না। বাঙালিকে পরাধীন রাখতে পারে এমন কোনো শক্তি পৃথিবীতে আর নাই।’
৭ মার্চের ভাষণের পর পরই শুরু হয়ে যায় স্বাধীনতাকামী বাঙালিদের খণ্ড খণ্ড যুদ্ধ। যার যা আছে তাই নিয়ে বাংলার সর্বত্র প্রতিরোধ গড়ে তুললো। আর পশ্চিমা নরপিশাচের দল শুরু করলো হত্যাযজ্ঞ। অবশেষে ২৫ মার্চ কালরাত্রিতে পৃথিবীর সকল মানবতাকে পদদলিত করে নিরীহ নিরস্ত্র ঘুমন্ত বাঙালির উপর পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী শুরু করে ‘অপারেশন সার্চ লাইট’ নামের পৃথিবীর সবচেয়ে নারকীয় বর্বরোচিত গণহত্যাযজ্ঞ। পৃথিবীর ইতিহাসে কুখ্যাত এক জেনোসাইডের নাম “অপারেশন সার্চলাইট”। এটা ছিল স্মরণকালের পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কর্তৃক পরিচালিত পরিকল্পিত গণহত্যা, যার মাধ্যমে তারা ১৯৭১ এর মার্চ ও এর পূর্ববর্তী সময়ে সংঘটিত বাঙালির আন্দোলনকে দমন করতে চেয়েছিল। এই গণহত্যা ছিল পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের আদেশে পরিচালিত, যা ১৯৭০ এর নভেম্বরে সংঘটিত “অপারেশন ব্লিটজ এর পরবর্তী অনুষঙ্গ। পাকিস্তানি পরিকল্পনাকারিদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, “অপারেশন সার্চলাইট” এর মূল লক্ষ্য ছিল আওয়ামী লীগের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং সারা পূর্বপাকিস্তানে একযোগে অপারেশন শুরু করা, সর্বোচ্চ সংখ্যক রাজনৈতিক ও ছাত্র সংগঠনের নেতা, সাংস্কৃতিক সংগঠনের সথে জড়িত ব্যক্তিবর্গ এবং শিক্ষকদের গ্রেফতার করা, সেনানিবাসকে সুরক্ষিত রাখা, ঢাকায় অপারেশন ১০০% সফল হওয়া, টেলিফোন, টেলিভিশন, রেডিও ও টেলিগ্রাফ সহ সকল অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করে দেয়া, সকল পূর্বপাকিস্তানি (বাঙালি) সৈন্যদলকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ কেড়ে নিয়ে নিস্ক্রিয় করে দেয়া, আওয়ামী লীগের মনে ভুল ধারণা সৃষ্টি করে তাদের ব্যস্ত রাখার জন্য ইয়াহিয়া খান আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার অভিনয় করবেন। ঢাকা, খুলনা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, যশোর, রাজশাহী, রংপুর, সৈয়দপুর এবং সিলেট এ পূর্ব নির্ধারিত আক্রমণাতœক অপারেশন পরিচালনা করা এবং পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্যদের সমাবেশ জোরদার করেছিল।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্য রাতে শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হন। গ্রেপ্তার হবার একটু আগে ২৫ শে মার্চ রাত ১২ টার পর (অর্থাৎ, ২৬ শে মার্চের প্রথম প্রহরে) তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেন যা ওয়ারলেস বার্তার মাধ্যমে চট্টগ্রামে আওয়ামীলীগের নেতৃস্থানীয় নেতৃবৃন্দের কাছে পৌঁছে যায়। ঘোষণাটি নিম্নরূপ : “এটাই হয়ত আমার শেষ বার্তা, আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। আমি বাংলাদেশের মানুষকে আহ্বান জানাই, আপনারা যেখানেই থাকুন, আপনাদের সর্বস্ব দিয়ে দখলদার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত প্রতিরোধ চালিয়ে যান। বাংলাদেশের মাটি থেকে সর্বশেষ পাকিস্তানি সৈন্যটিকে উৎখাত করা এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের আগ পর্যন্ত আপনাদের যুদ্ধ অব্যাহত থাকুক। ২৬ শে মার্চ বেলাল মোহাম্মদ, আবুল কাসেমসহ চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্রের কয়েক’জন কর্মকর্তা ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা এম এ হান্নানের মাধ্যমে প্রথম শেখ মুজিব এর স্বাধীনতার ঘোষণাটি প্রচার করেন। পরে চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর হয়ে সেনাবাহিনীর বাঙালি অফিসার মেজর জিয়াউর রহমান আমাদের স্বাধীনতার ঘোষণা পত্র পাঠ করেন।
এই ঘোষণার মধ্য আনুষ্ঠানিকভাবে বাঙালি শুরু করে মরণপণ স্বাধীনতা সংগ্রাম মুক্তিকামী বাঙালি জাতি উদ্দীপ্ত হন। জেগে উঠে বাঙালি জাতি। যা নয় মাস স্থায়ী হয়। নয় মাসের সেই রক্তঝরা সংগ্রামের আমরা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি জাতির সেসব শ্রেষ্ঠ সন্তানকে যাদের আত্মত্যাগে আজকের বাংলাদেশ। সুদীর্ঘ নয় মাসের কঠোর সংগ্রামে বাংলার আপামর জনগণ ছিনিয়ে আনে ‘স্বাধীনতা’- আত্মত্যাগ আর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত অমূল্য সম্পদ –
প্রিয় স্বাধীনতা, স্বাধীন পতাকা, স্বাধীন মানচিত্র। বিশ্ব মানচিত্রে স্বাধীন জাতি হিসেবে স্থান করে নিতে জাতির অবিসংবাদিত নেতা, রাজনীতির মহানায়ক, বাংলাদেশের স্থপতি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একটি অবিস্মরণীয় ও যুগান্তকারী নাম হয়েছিলেন। চলার পথ যতই বন্ধুর হোক না কেন বঙ্গবন্ধু সকল বাধা-প্রতিবন্ধকতাকে উপেক্ষা করে ইতিহাসের মহাসড়কের পথ ধরে নিজস্ব পথ তৈরি করে এগিয়ে অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির ধারক বাহক হয়ে এগিয়ে গেছেন। বঙ্গবন্ধুর লক্ষ্য ছিল এদেশের মানুষের কল্যাণ সাধন এবং স্বাধীনতার অধিকার, স্বায়ত্তশাসন ও গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলনে বাঙালি জাতিকে একটি চেতনায় ঐক্যবদ্ধ করা । পর্যায়ক্রমে বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতির মনে সূর্যের আলোর প্রদীপ্ত শিখা প্রজ্জ্বলিত করেছেন, জাতিকে করেছেন আত্মসচেতন, জাগিয়েছেন বাঙালি জাতীয়তাবাদের বোধশক্তি। বঙ্গবন্ধুর দেশপ্রেম, সত্যনিষ্ঠা, আপসহীন মনোভাব তাঁকে করে তুলেছিল অসাম্প্রদায়িক ও মানবতাবাদী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বে এবং বিশ্বরাজনীতিতে একজন প্রজ্ঞাবান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছিলেন। তিনি ইতিহাস সৃষ্টি করে ইতিহাসের পাতায় চিরভাস্বর , অমর হয়ে থাকবেন এ বাংলার বুকে ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শ, ত্যাগ, দূরদর্শিতা এবং অকুতোভয় আপোসহীন নেতৃত্বে দেশ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর কবল থেকে মুক্ত হয়েছিল। বাঙালি জাতি পেয়েছিল হাজার বছরের আকাঙিক্ষত প্রিয় স্বাধীনতা, স্বাধীন পতাকা, স্বাধীন মানচিত্র। শেখ মুজিবের অপরিসীম আত্মত্যাগের ফসলই হচ্ছে স্বাধীন বাংলাদেশ। শেখ মুজিব ও বাংলাদেশ একে অপরের অবিচ্ছেদ্য অংশ। একটিকে বাদ দিয়ে অপরটিকে কল্পনা করা যায় না।’ মুজিবের তেজোদীপ্ত মনোভাবের কাছে স্বৈরাচারী পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠী প্রতিহত হয়েছে। তাই কবি জিল্লুর রহমানের কাব্যিক ছন্দে বলতে হয়- ‘বাংলার মাটিতে তোমার জন্ম বলেই এ মাটি হয়েছে ধন্য, আকাশের কালো মেঘ ভেদ করে এনেছ যে স্বাধীনতা, তুমি আর কেউ নও, বার কোটি বাঙালির স্বপ্নের পুরুষ জাতির জনক শেখ মুজিবর রহমান। আর আমরা বিশ্বের যে কোন প্রান্তে গিয়ে সগৌরবে বলতে পারি আমি বাঙালি, বাংলা আমার দেশ, বাংলা আমার মায়ের ভাষা।’ এই গৌরবগাথা এ ভূখন্ডের হৃদয়ের সম্রাট হয়ে অমর, অজেয় অবিনশ্বর এবং শোষিত, বঞ্চিত, নিপীড়িত ও নির্যাতিত মানুষের মুক্তির ইতিহাসে একজন কিংবদন্তি।
বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলন , মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সৃষ্টির সময়ে আমাদের প্রজন্ম খুবই ভাগ্যবান এবং আমাদের চোখের সামনে বাঙালি জাতির ইতিহাসের নির্মাণ দেখেছি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের সময়ে আমি শৈশবে একাত্তরের সংগ্রামমুখর দিনগুলো দেখেছিলাম। মার্চ এলেই মুক্তিযুদ্ধের অগ্নিঝরা দিনগুলোর স্মৃতি মনকে আবার জাগিয়ে তোলে। পাকহানাদার ও তাদের দোসরদের নিকৃষ্ঠতম কর্মকাণ্ডগুলো ও একাত্তরের ঘটনা প্রবাহ উপলব্ধি করেছিলাম। অনুভুবের সীমাহীন জিজ্ঞাসায় গভীর মৌনতায় স্বাধীনতাসংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের মানে খুঁজতাম। মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলো কিছু প্রত্যক্ষ ঘটনাপ্রবাহ মনের অলিন্দে সংগ্রামী সত্বার চেতনাকে জাগিয়ে তোলে। তখন যদি যুবা হতাম অবশ্যই দেশ মাতৃকার জন্যে মুুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতাম। অবশ্য মুক্তিযোদ্ধারা যখন আমাদের গ্রামে তাদের আস্তানা স্থাপন করেছিল তখন তাদের অস্ত্র, গোলা বারুদ খুটিয়ে খুটিয়ে দেখতাম। শিশু মনে তখন জেগে উঠতো অন্য এক সত্তা যদি মুক্তিযোদ্ধাদের সহযাত্রী হতে পারতাম। বিআইটি (বর্তমানে চুয়েট) তে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আস্তানা স্থাপন করেছিল। আমাদের গ্রাম কদলপুর বিআইটি থেকে ১ থেকে ১ত(১,২) কিলোমিটার দূরে। মুক্তিযুুদ্ধের সময় ঊনসত্তর পাড়া বিদ্যালয়ের পাশেই পাকিস্তানি সামরিক জান্তার দোসর রাজাকার আলবদর, মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ শক্তির উন্মত্ততায় অসংখ্য হিন্দুকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। অনেক হিন্দু জনগোষ্ঠী আমাদের গ্রামে আশ্রয় নিয়েছিল। তাদের পূর্ণ নিরাপত্তার জন্য আমাদের গ্রামের আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সহযোগিতা করেছিল এমনকি আমাদের প্রতিবেশী মুসলমান ভাইয়েরা একাত্ম হয়েছিল।
মুক্তিযুদ্ধের আরেকটি ঘটনার বিবরণ না দিলে আমার শৈশবের স্মৃতিগুলো অপ্রকাশিত থেকে যায়। যুদ্ধকালীন সময়ে কিছুদিনের জন্য আমি আমার মা রাউজানের উরকিরচর ইউনিয়নের আবুরখীল গ্রামে মাসীর বাড়ি চলে যায়। সেখানে একদিন এক আত্মীয়ের বাড়ি থেকে ফিরতে সন্ধ্যায় আবুরখীল অমিতাভ স্কুলের কাছাকাছি মুক্তিযোদ্ধা ও রাজাকারদের সম্মুখ যুদ্ধে আমার দুই দাদাসহ মধ্যখানে পড়ে যায়। প্রচণ্ড গুলিবিনিময় চলছিল। নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য এক গৃহস্থের বাড়ির পাশে পুকুরের পাড় ঘেষে দাদাদের সাথে উপূড় হয়ে শুয়ে থাকি। মাথার ওপর দিয়ে আগুনের ফুলকির মতো গুলি যাচ্ছে। অবিশ্বাস্যভাবে আমরা বেঁচে যায়। কিন্তু ওই রাতে একজন অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধা সম্মুখ সমরে নিহত হন। মুক্তিযুদ্ধের সময় বাবা চাকুরী করতেন ঢাকায়। কোন খোঁজ খবর ছিল না। আমার মা দীর্ঘশ্বাস ফেলতেন এবং বলতেন তোর বাবা কি এই যুদ্ধের ময়দান পেরিয়ে ফিরে আসবে। শৈশবের কোমল হৃদয়ে বাবা হারানোর বেদনায় চোখগুলো ছলছল করে উঠতো। কিন্তু হঠাৎ একদিন ফিরে এলো আমার জন্মদাতা ক্লান্ত, বিধ্বস্থ শরীরে। তার ফিরে আসার কাহিনী অনেক দীর্ঘ। পায়ে হেঁটে দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে বাবা ফিরে এসেছিলো আমাদের মাঝে। এটা গল্প নয়। আমার শৈশবে মনের গহীনে যে প্রত্যক্ষ ঘটনাগুলো ক্যানভাসে আঁকা হয়েছিল আজকের এই ৪৫ তম স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে লেখনীতে প্রকাশ করলাম। জয় বাংলাে াগানে খুব নিবিড়ভাবে আবিষ্ঠ ছিলাম। রেডিওতে শুনতাম যুদ্ধদিনের গান।ে াগানগুলো আওরাতাম- এক মুজিব কারাগারে, লক্ষ মুজিব ঘরে ঘরে। জেলের তালা ভাঙবো, শেখ মুজিবকে আনবো ইত্যাদি ইত্যাদি। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিময় কিছু প্রত্যক্ষ ঘটনার ও স্বাধীনতার ইতিহাসের সাক্ষী হতে পেরে নিজেকে গৌরবান্বিত মনে করছি এবং নিজের চোখে একাত্তর দেখেছি, প্রতিরোধ দেখেছি, সংগ্রাম দেখেছি পাকিস্তানি দস্যুদের নিপীড়ন, হত্যাযজ্ঞ দেখেছি, আলবদর, আলশাসমদের নির্যাতন, লুণ্ঠন দেখেছি এবং একাত্তরে বাঙালি, বাংলা মায়ের দামাল ছেলেদের বিজয় দেখেছি, লাল সবুজের পতাকা দেখেছি। দেখেছি পরম বিস্ময়ে জেগে উঠা বাঙালি জাতিকে। পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে ও অসংখ্য মা বোনের সম্ভ্রম হানি এ যেন রক্তের দামে কেনা স্বাধীনতা।
শীর্ষ যুদ্ধাপরাধী ও মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং কিছু সম্পন্ন হয়েছে। অশুভ শক্তির নিকৃষ্ট ষড়যন্ত্রকে প্রতিরোধ করে ষোল কোটি মানুষের স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশকে রক্ষা করার প্রত্যয়ে জাতিকে আরো তৎপর ও মনোযোগী হতে হবে, করতে হবে ত্যাগ স্বীকার। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় স্বাধীনতার পক্ষের শক্তিকে সদাজাগ্রত থেকে আগামীর পথে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়কে সুদৃঢ় করতে হবে। শুদ্ধ রাজনৈতিক পরিবেশ এ সমৃদ্ধ গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন বঙ্গবন্ধু তনয়া ও গণতন্ত্রের মানসকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা । অর্থনৈতিক মুক্তি ও উন্নয়নের পথে বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে এটাই আমাদের প্রত্যাশা। মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি সশ্রদ্ধ প্রণতি যারা আত্মবলিদানে আমাদের দিয়ে গেছে স্বাধীন মাতৃভূমি যেখানে আমরা সবাই বাঙালি, মায়ের ভাষা বাংলায় কথা বলি। জাতি চিরকাল স্মরণ করবে অকুতোভয় বীর যোদ্ধাদের। ৩০ লাখ শহীদের আত্মদান, অপরিসীম ত্যাগ আর বীরত্বগাঁথা সমুন্নত রাখতে দেশপ্রেমের চেতনায় আত্মমর্যাদাশীল সমৃদ্ধ জাতি হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয়ে আমাদের ইতিহাসের মহাসড়কের পথ ধরে নিজস্ব পথ তৈরি করে এগিয়ে যেতে হবে তবেই শাণিত হবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং সোনালী সূর্যের আলোয় উদ্ভাসিত হবে আমাদের এ প্রিয় স্বদেশ । (সংগৃহীত)
লেখক : প্রাবন্ধিক , কলাম লেখক ও সহকারী রেজিস্ট্রার, বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ।
Facebook Comments Box

সাম্প্রতিক খবর:

কুয়েতে শেষ হলো আকামা বদলের সুযোগ, ২৭ হাজার প্রবাসীর খাত পরিবর্তন

খাদ্য নিরাপত্তা ও নাগরিক সচেতনতা: উন্নত বিশ্বের চেয়ে আমরা ঠিক কতটা পিছিয়ে?

কুয়েতের মরুভূমিতে লাল-সবুজের বিপ্লব

টানা পঞ্চম জয়! কুয়েত সামার লিগের উদ্বোধনী ম্যাচে সিলেট সিক্সার্সের বড় জয়

কুয়েতের আদালতে বাংলাদেশি নাগরিকের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, ভারতীয় নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড বহাল

বিদেশী বিনিয়োগকারীদের ১৫ বছরের দীর্ঘমেয়াদী রেসিডেন্সি দিচ্ছে কুয়েত

কুয়েত প্রবাসী কবি ও সাহিত্যিক সঞ্জীব ভদ্র চন্দন আর নেই, বাংলাদেশ প্রেসক্লাব কুয়েতের শোক প্রকাশ

প্রবাসের গণ্ডি পেরিয়ে এবার জন্মভূমির সেবায় কামাল হোসেন ভূঁইয়া

কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলা ও বিমান চলাচল স্থগিত

রাজনীতির উজ্জ্বল নক্ষত্র তোফায়েল আহমেদ


এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



Exchange Rate

Exchange Rate EUR: Fri, 28 Aug.

সর্বশেষ খবর



Agrodristi Media Group

Advertising,Publishing & Distribution Co.

Editor in chief & Agrodristi Media Group’s Director. AH Jubed
Legal adviser. Advocate Musharrof Hussain Setu (Supreme Court,Dhaka)
Editor in chief Health Affairs Dr. Farhana Mobin (Square Hospital, Dhaka)
Social Welfare Editor: Rukshana Islam (Runa)

Head Office

UN Commercial Complex. 1st Floor
Office No.13, Hawally. KUWAIT
Phone. 00965 65535272
Email. agrodristi@gmail.com / agrodristitv@gmail.com

Bangladesh Office

Director. Rumi Begum
Adviser. Advocate Koyes Ahmed
Desk Editor (Dhaka) Saiyedul Islam
44, Probal Housing (4th floor), Ring Road, Mohammadpur,
Dhaka-1207. Bangladesh
Contact: +8801733966556 /+8801316861577

Email Address

agrodristi@gmail.com, agrodristitv@gmail.com

Licence No.

MC- 00158/07      MC- 00032/13

Design & Devaloped BY Popular-IT.Com
error: দুঃখিত! অনুলিপি অনুমোদিত নয়।