বিশ্বসাহিত্যের মূল্যবান ও প্রসিদ্ধ গ্রন্থাবলি তিনি নিবিষ্ট মনে পাঠ করেন এবং সাহিত্যের রস গ্রহণ ও আনন্দ উপভোগ করেন। বিচিত্র বিষয়ে জানার ও তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের প্রণোদনা তাঁকে এক দেশ থেকে অন্য দেশে টেনে নিয়ে গেছে আধুনিক বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অনন্যসাধারণ এক মহামনীষীর নাম সৈয়দ আলী আহসান । একাধারে আধুনিক কবি, মেধাবী সমালোচক, প্রখর শিল্পবোদ্ধা, শ্রেষ্ঠ সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এবং আধুনিক বাংলা গদ্যের নিপুণ কারিগর তিনি। ইংরেজি সাহিত্যে সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়েও আজীবন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের সেবা করে গেছেন। বাংলা বিষয়ে অধ্যাপনা করেছেন সুদীর্ঘকাল । অসামান্য কৃতিত্ব প্রদর্শন করেছেন বাংলা গদ্যে রচিত তার কিছু রচনায় ।
শিক্ষা সমাপ্তির পর কলকাতায় শুরু করেন সাহিত্য সাধনা ও চাকরি জীবন। আধুনিক বাংলা কবিতার পাশাপাশি লেখেন- বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত, আধুনিক কবিতা- শব্দের অনুষঙ্গে, রবীন্দ্রনাথ : কাব্যবিচারের ভূমিকা, জীবনের শিলান্যাস ও মহানবী (স:)। এসব গ্রন্থে আধুনিক বাংলা গদ্যের বিস্ময়কর উৎকর্ষতা ফুটে উঠেছে চমৎকারভাবে এবং মাধুরীমিশ্রিত ভাষায় ও উৎকৃষ্ট শৈলীতে।
চল্লিশের দশকে কলকাতায় আবির্ভাব ঘটেছিল কিছু আধুনিক কবির, যারা আধুনিক বাংলা কাব্যে নব এক জীবন জিজ্ঞাসা, প্রগতিবাদ এবং নাস্তিকতার চিন্তাচেতনার প্রকাশ ঘটিয়েছিলেন। রবীন্দ্র-নজরুল বলয়ের বাইরে অবস্থান করে এরা কাব্য জগতে আবির্ভূত হন। পুঁজিবাদী ধ্যানধারণা পরিহার করে সমাজতান্ত্রিক
চিন্তাচেতনার নিরিখে সব কিছু ঢেলে সাজানোর যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। চমকও সৃষ্টি করেছিলেন খানিকটা। এদের পুরো ভাগে ছিলেন সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, বিষ্ণুদে ও সুভাষ মুখোপাধ্যায়। এরা সৈয়দ আলী আহসান ও ফররুখ আহমদ প্রমুখ কবিদের তাদের মেধা ও রচনা কুশলতায় চমৎকৃত ও বিস্ময়াবিভূত করেছিলেন। কিন্তু এরা যখন নাস্তিকতাকে তাদের প্রবৃত্তির আদর্শ করেছিলেন, সাহিত্যের লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছিলেন বস্তুবাদী মতাদর্শ প্রচার-প্রসারের, তখন সৈয়দ আলী আহসান এদের পথে যাননি।
বর্তমান নিবন্ধকারের কাছে লিখিত একপত্রে মনীষী সৈয়দ আলী আহসান লেখেন : একসময় কলকাতায় যখন সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, বিষ্ণুদে প্রমুখ কবি নাস্তিকতাকে তাদের প্রবৃত্তির আদর্শ করেছিলেন তখনই আমার মনে একটি বির“দ্ধতার সৃষ্টি হয়েছিল। আমি এদের উভয়কেই জানতাম এবং উভয়ের মেধা এবং রচনা কুশলতার প্রতি আমার শ্রদ্ধা ছিল কিন্তু তাঁদের বিশ্বাসহীনতা আমাকে খুব পীড়িত করত। বলা যেতে পারে তাদের বির“দ্ধে একটি প্রতিবাদের ইচ্ছায় আমরা অর্থাৎ আমি ও ফরর“খ সত্য ও বিশ্বাসকে প্রকাশ করার অঙ্গীকার করেছিলাম।’
মনীষী সৈয়দ আলী আহ্সান পৃথিবীর অনেক দেশ-জাতির লীলা কেন্দ্রগুলো, বিশেষ করে তাদের সভ্যতা ও সংস্কৃতির পীঠস্থানগুলো ব্যাপকভাবে ঘুরে ফিরে অবলোকন করেন। পাশ্চাত্য সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রধান প্রধান কেন্দ্রগুলোর পুরোধাবৃন্দের সঙ্গে শখ্য স্থাপন করেছিলেন। অত্যন্ত— কাছ থেকে এদের জীবন ও জীবিকার হালচাল এবং মননের গভীরে প্রবেশের সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু সৈয়দ আলী আহসানরা এদের ব্যক্তিত্বের বিভায় বিমুগ্ধ হয়েও মন্ত্রমুগ্ধ হননি মোটেই। তাদের জীবনপদ্ধতি ও জীবনদর্শনের কাছে আত্মসমর্পিত হননি। বরং হেরার রাজতোরণের সম্মুখে সমর্পিত হয়েই লেখলেন : হে প্রভু! আমি উপস্থিত, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামে অসামান্য সব রচনা সম্ভার।
মনীষী সৈয়দ আলী আহসান সত্যকে আঁকড়ে ধরেছিলেন সেই কৈশোরেই। সুফি পরিবারে জন্মগ্রহণকারী সৈয়দ আলী আহসান মানবজীবনে সত্য-সুন্দরের প্রকাশকে সর্বদাই অগ্রাধিকার দিয়েছেন । জীবনের নানা ক্ষেত্রে ও স্থানে তাকে কর্মরত থাকতে হয়েছে। নানা ধরন ও আদর্শের মানবমÊলীর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছিল তার। সবার মাঝেই সত্য-সুন্দরের বিভা খুঁজে ফিরেছেন আমৃত্যু ।
অটল থেকেছেন তার পথ ও মতে। মনীষী সৈয়দ আলী আহসান ছিলেন অসাধারণ মেধাবী। প্রখর মেধা শক্তি ব্যবহার করে মাতৃভাষা বাংলা ছাড়াও প্রায় পাঁচ-ছটি ভাষায় পারদর্শিতা অর্জন করেছিলেন। পৃথিবীর অনেক দেশ ভ্রমণ করে, অনেক ভাষা ও সাহিত্যের সঙ্গে পরিচিত হন। বিশ্বসাহিত্যের মূল্যবান ও প্রসিদ্ধ গ্রন্থাবলি তিনি নিবিষ্ট মনে পাঠ করেন এবং সাহিত্যের রস গ্রহণ ও আনন্দ উপভোগ করেন। বিচিত্র বিষয়ে জানার ও তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের প্রণোদনা তাকে এক দেশ থেকে অন্য দেশে টেনে নিয়ে গেছে। ¯^াভাবিকভাবে নানা শ্রেণীর গুণীজন, প্রাজ্ঞ মনীষীগণের সান্নিধ্য তিনি লাভ করেছেন। যুগ ও কালের ব্যবধানে কাউকে তিনি মনের মধ্যে গেঁথে রেখেছিলেন, আবার কাউকে বেমালুম ভুলেও গিয়েছেন। কিন্তু কদাচিৎ স্মরণের পর্দায় কারো ছবি স্মৃতি ভেসে ওঠামাত্র তার সম্পর্কে দু’চার কলামে তার ভালো লাগা ও মন্দ লাগার বিষয়টা লিপিবদ্ধ করে গেছেন। এই যে, কৃতজ্ঞতাবোধ এটি মনীষী সৈয়দ আলী আহসানের বিশেষ গুণ ও বৈশিষ্ট্য, যা সচরাচর দেখা পাওয়া দুর্লভ আমাদের এই অকৃতজ্ঞ ও ¯^ার্থপরতার কালো পর্দায় আপাদম¯—ক আবৃত পলিমাটির এই দেশে।
মনীষী সৈয়দ আলী আহসান জীবনে অনেক ভাষাভাষী অনেক গুণীজনের নৈকট্য লাভ করেছেন, মিশেছেন নিবিড়ভাবেও। কিন্তু কারো দ্বারাই বিশেষভাবে প্রভাবান্বিত হয়ে খোল-নলচে পালটে ফেলেননি কোনো দিন। জীবনের যৌবনারম্ভে যে প্রত্যয়ের প্রতি তিনি প্রতীতি প্রকাশ করেছিলেন- ‘ইসলামের মূল প্রজ্ঞায় প্রত্যাবর্তন’ এবং ‘ইসলামের প্রথম যুগের সৌরভের কাছে আত্মসমর্পণই’ তাকে এক স্থির লক্ষ্যের পানে ধাবিত করেছে সারাটি জীবন। এ ক্ষেত্রে মনীষী সৈয়দ আলী আহসান ছিলেন নিতান্ত— নিরাপোস। শাশ্বত সত্যের লক্ষাযাভিসারী, রাসূল প্রেমিক, বিশ্ব নিয়ন্তার একান্ত— বাধ্যগত বান্দা।
মনীষী সৈয়দ আলী আহসান কর্মজীবনে যত রকম পোস্ট-পজিশন পেয়েছেন, যত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন, তিনি তার প্রখর মেধা ও অসাধারণ যোগ্যতার বলেই পেয়েছেন। সেখানে তেমন তদবির ও তোষামোদের প্রয়োজন পড়েনি।
অথচ দীর্ঘকাল এ মহান মনীষীর বির“দ্ধে একদল অপরিণামদর্শী সুচতুর মানুষ, একশ্রেণির পরগাছা বুদ্ধিজীবী কত না কটুবাক্য উচ্চারণ করেছেন, কতভাবে না তাকে অপমানিত করার অপপ্রয়াস চালিয়েছেন তার কোনো ইয়ত্তা নেই।
মনীষী সৈয়দ আলী আহসান সারাজীবন তথাকথিত ‘মহাজনদের’ কোপানলে পড়ে অনেক মর্মপীড়া অনুভব করেছেন। ব্যথিতচিত্তে, মর্মবেদনায় সীমাহীন কষ্ট ভোগ করেছেন; তবু এসব মেধাশূন্যের দাপট ও প্রভাবের কাছে মাথা নত করেননি কোনো দিন।
কেননা তিনি ছিলেন অত্যন্ত— ধৈর্যশীল, পরমতসহিষ্ণু এবং প্রখর বুদ্ধিদীপ্ত; যার মাথা শুধুমাত্র অবনত হতো সেই মহান মাওলার সমীপে- যিনি সবা শক্তি ও সামর্থ্যর একমাত্র উৎস ও আধার।
সৈয়দ আলী আহসানরা মনীষার বরপুত্র হয়েই জন্মেন এবং জীবনব্যাপী সেই মনীষার আলোকচ্ছটায় শুধু স্বদেশ নয় ; পুরো বিশ্বকেই উদ্ভাসিত করে বিশ্ববরেণ্য হয়ে যান। এরা কালিক হয়েও চিরকালীন এবং দৈশিক হয়েও বৈশ্বিকরূপে বরিত হন। এমন বিরল প্রতিভার জন্ম সব শতকে হয় না বরং কয়েক শতকের ব্যবধানে এরা আবির্ভূত হন দেশ-জাতি তথা বিশ্বের সমূহ কল্যাণের নিমিত্তে। এরা আঘাতপ্রাপ্ত হন কিন্তু প্রত্যাঘাত করেন না কাউকে। সে শিক্ষা তারা পান না। সৈয়দ আলী আহসানরা জীবনের সব ¯—রে এমন মহৎ চরিত্রের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেন বলেই মনীষা তাদের জীবনের জ্যোতি হয়ে যায়। যে জ্যোতি তাদের পিচ্ছিল- বন্ধুর পথ অতিক্রম করতে অকৃত্রিম বন্ধুর ভূমিকা পালন করে।











