আরব সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রায় আগর, আতর এবং সুগন্ধির ব্যবহার কেবল একটি সাধারণ অভ্যাস নয়, বরং এটি তাদের হাজার বছরের ঐতিহ্য, আভিজাত্য এবং ধর্মীয় অনুভূতির এক গভীর বহিঃপ্রকাশ। মরুভূমির শুষ্ক ও উত্তপ্ত আবহাওয়ায় শরীর ও মনকে সতেজ রাখার ব্যবহারিক প্রয়োজন থেকেই মূলত আরবে সুগন্ধির ব্যাপক প্রচলন শুরু হয়েছিল, যা কালক্রমে তাদের সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে।

ইসলামের ইতিহাসে সুগন্ধি ব্যবহারের প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে; মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) সুগন্ধি অত্যন্ত পছন্দ করতেন এবং এটি ব্যবহারের তাগিদ দিয়েছেন, যা আরব মুসলিমদের কাছে সুগন্ধিকে একটি পবিত্র ও মর্যাদাপূর্ণ স্থানে অধিষ্ঠিত করেছে। বিশেষ করে ‘আগর’ বা ওদ এবং এর থেকে উৎপাদিত ‘আতর’ আরব সমাজে আভিজাত্য ও আতিথেয়তার প্রতীক হিসেবে গণ্য হয়। ঘরে কোনো সম্মানিত অতিথি এলে তাকে আগর কাঠের ধোঁয়া (বখুর) দিয়ে অভ্যর্থনা জানানো এবং বিদায়বেলায় কাপড়ে দামি আতর লেপে দেওয়া আরবীয় শিষ্টাচারের এক অনন্য নিদর্শন।

মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম ধনী দেশ কুয়েতে
আগর-আতর ব্যবসার সূচনা বহু যুগ আগে। তবে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মাধ্যমে এই ব্যবসার শুরু হয়েছিল প্রায় চার দশক আগে। তৎকালীন সময়ে সিলেট অঞ্চলের দূরদর্শী প্রবাসীদের হাত ধরেই কুয়েতের বাজারে এই সুগন্ধি বাণিজ্যের গোড়াপত্তন ঘটে। দীর্ঘ সময় ধরে অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে এই ঐতিহ্যবাহী ব্যবসা ধরে রেখেছেন কুয়েতে সিলেটের প্রখ্যাত আগর-আতর ব্যবসায়ী আব্দুল হাই মামুন, হাজী জুবের আহমদ, শওকত আলী এবং আব্দুর রবসহ আরও অনেকে। অবাক হওয়ার বিষয় হলো, কুয়েতের বুকে সুগন্ধির এই সাম্রাজ্য গড়ে তোলা অগ্রজ ব্যবসায়ীদের প্রায় সবাই মৌলভীবাজার জেলার ঐতিহ্যবাহী ও সুগন্ধি সমৃদ্ধ উপজেলা বড়লেখার বাসিন্দা, যা এই অঞ্চলকে বিশ্ব দরবারে সুগন্ধির এক অনন্য রাজধানী হিসেবে পরিচিত করেছে।


প্রবীণ ও সফল সুগন্ধি ব্যবসায়ীদের এই ধারাবাহিক উন্নতি এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি দেখে ধীরে ধীরে কুয়েতে সাধারণ বাংলাদেশি নাগরিকদের মাঝেও এই লাভজনক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ার এক ব্যাপক আগ্রহ ও প্রবণতা তৈরি হতে দেখা যায়।
অগ্রজদের দেখানো পথ ধরে বর্তমান প্রজন্মের তরুণ প্রবাসী ব্যবসায়ীরাও আধুনিক বিপণন ব্যবস্থা ও সৃজনশীল মেধা কাজে লাগিয়ে এই সুগন্ধি শিল্পে ব্যাপকভাবে সম্পৃক্ত হচ্ছেন। তেমনই এক উজ্জ্বল, স্বপ্নবাজ ও সফল তরুণ প্রবাসী বাংলাদেশি উদ্যোক্তার নাম মাহমুদ বিন মনির।

মরুভূমির তপ্ত বুকে রাজকীয় আভিজাত্য আর সুগন্ধির এক অনন্য প্রতীক হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের সিলেটের আগর ও আতর। কঠোর পরিশ্রম, মেধা আর শতভাগ সততাকে পুঁজি করে মাত্র ৩ বছরের সংক্ষিপ্ত সময়ে কুয়েতের স্থানীয় বাজারে এক অভাবনীয় ও অনন্য সফলতার গল্প গেঁথেছেন এই তরুণ উদ্যোক্তা। আরবের ধনকুবেরদের মন জয় করে বিশ্ব দরবারে ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ডের এই সুগন্ধিকে তিনি যেভাবে তুলে ধরছেন, তা আজ কুয়েত প্রবাসীদের মাঝে এক গর্বের উপাখ্যান হয়ে উঠেছে। এই অভূতপূর্ব সাফল্যের নেপথ্য গল্প ও নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে তরুণ উদ্যোক্তা মাহমুদ বিন মনির বলেন, “কুয়েতের স্থানীয় নাগরিকরা অনেকে আমাকে এখন চিনে জানে শুধুমাত্র বাংলাদেশের আগর-সুগন্ধির জন্য। আমাদের দেশের আগর-আতর শিল্প একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় ও ঐতিহ্যবাহী খাত, যার মূল কেন্দ্র মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলার সুজানগর ইউনিয়ন। মাত্র ৩ বছর আগে যখন আমি কুয়েতে আসি, তখন এখানে দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী আমার শ্রদ্ধেয় বাবার সহযোগিতায় ও দিকনির্দেশনায় এই সুগন্ধি ব্যবসা শুরু করি। বর্তমানে বড়লেখা থেকে সরাসরি আমদানি করা এই বিশ্বমানের সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক ও খাটি আগর বিক্রি করে আমি বেশ লাভবান হচ্ছি। আরবের মানুষ, যারা সুগন্ধির গুণগত মান ও আভিজাত্যের বিষয়ে অত্যন্ত জহুরি এবং পারদর্শী, তারাও মুগ্ধ হচ্ছেন বাংলাদেশের এই তরল সোনায়।” নিজের সুদূরপ্রসারী কর্মপরিকল্পনা ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ব্র্যান্ডিং নিয়ে মাহমুদ আরও যোগ করেন, “গত দুই বছর ধরে কুয়েতের আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী কেন্দ্র ‘মুশরেফ’-এ আয়োজিত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় এক্সিভিশনে (মেলা) অংশ নিয়ে আমি অত্যন্ত গর্বের সাথে প্রদর্শন করছি ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ডের সুগন্ধি। মেলাগুলোতে বাংলাদেশের আগরকে স্থানীয় কুয়েতি নাগরিক এবং বিশ্ব ক্রেতাদের কাছে সুপরিচিত করতে আমি নিরলসভাবে ভূমিকা রেখে যাচ্ছি। সরকারি ও বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগে এই শিল্পকে যদি বিশ্বব্যাপী আরও বড় পরিসরে রপ্তানি করা সম্ভব হয় এবং সংশ্লিষ্টদের আন্তরিক সহযোগিতা পাওয়া যায়, তবে তা দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে ও রেমিট্যান্স প্রবাহে এক বিশাল ও যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে।”

চোখে একরাশ স্বপ্ন আর বুকে আপনজনদের ভালো রাখার তাগিদ নিয়ে পথচলা শুরু করা এই ক্লান্তিহীন তরুণের ঘাম ও মেধা আজ ছুঁয়ে গেছে কাঙ্ক্ষিত সাফল্যের সর্বোচ্চ চূড়া। কুয়েত প্রবাসী বাংলাদেশিরা মাহমুদের এই অনন্য ও দেশপ্রেমী উদ্যোগকে প্রবাসে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার এক নতুন দিগন্ত হিসেবে দেখছেন। কুয়েতের মাটিতে বাংলাদেশের নাম সগৌরবে উজ্জ্বল করা এবং আরবের উচ্চবিত্তদের ড্রয়িংরুমে সিলেটের বড়লেখা উপজেলার সুজানগর ইউনিয়নে উৎপাদিত এই সুগন্ধি পৌঁছে দেওয়া মাহমুদ বিন মনির নরসিংদী জেলার রাজনগর বাসগাড়ি গ্রামের কুয়েত প্রবাসী ব্যবসায়ী মনিরুল ইসলামের দ্বিতীয় সন্তান। তার এই আকাশছোঁয়া স্বপ্ন, সততা এবং সুদৃঢ় উদ্যোগ আজ প্রমাণ করেছে যে— মেধা, শতভাগ চেষ্টা এবং সঠিক ইচ্ছাশক্তি থাকলে প্রবাসের প্রতিকূল মাটিতেও যে কোনো বাধা পেরিয়ে সাফল্যের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছানো এবং দেশকে বিশ্বমঞ্চে সম্মানিত করা সম্ভব।

আ হ জুবেদ (সম্পাদক, অগ্রদৃষ্টি)











