চোখ ভরা স্বপ্ন আর বুক ভরা আশা ছিল মেয়েটির। শৈশব থেকেই স্বপ্ন দেখতো আকাশ ছোঁয়ার। সরকারী চাকরিজীবী পিতা মৃত আব্দুস সাত্তারের আদর্শে লালিত তৃতীয় সন্তান শিলা। শিশু বয়স থেকেই লেখাপড়া, গান, নাচ, কবিতা, আবৃত্তি, উপস্থাপনাতে ছিলেন ভীষণ পারদর্শী।
তাঁর মা চেয়েছিলেন তিনি যেন সব দিক দিকে পারদর্শী হয়ে ওঠেন। আর তাই ছোট বেলা থেকে সেভাবেই গড়ে তুলেছিলেন তিনি।
সিরাজগঞ্জের নিরিবিলি সবুজের মাঝে তিনি স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন আকাশ ছোঁয়ার। সিরাজগঞ্জের সালেহা ইসহাক সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এস.এস.সি এবং রাশিদাদ জোহা সরকারি মহিলা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় কৃতীত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন তিনি।
বাবা মারা যাবার পর পরিস্থিতি কিছুটা এলোমেলো হয়ে যায়। নাম লেখাতে ব্যর্থ হন সরকারী মেডিকেল কলেজে। পিতা মাতা ও পরিবারের সবার প্রচন্ড ইচ্ছে ছিল তিনি চিকিৎসক হবেন। চিকিৎসা ক্ষেত্রে রাখবেন, বিশেষ অবদান। সবার স্বপ্নকে সত্যি করার জন্যই তিনি ভর্তি হন নগরীর রায়ের বাজারস্থ শিকদার মহিলা মেডিকেল কলেজ এ্যান্ড হসপিটালে।
শৈশব থেকেই স্বপ্ন দেখতেন, ঢাকা মেডিকেল কলেজে পড়বেন। স্বনামধন্য চিকিৎসক হবেন। কিন্তু, সরকারী মেডিকেল কলেজে সুযোগ না পাওয়ার জন্য তাঁর মনের প্রতিজ্ঞা আরো দৃঢ় হয়ে ওঠে।
তিনি মনস্থির করেন, বেসরকারি মেডিকেল কলেজে লেখাপড়া করলেও সরকারি মেডিকেল কলেজের ছেলে মেয়েদের মতো যোগ্য হবেন।
মেডিকেল জীবনের তিনটি বোর্ডের পরীক্ষায় তিনি কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন। মেডিকেল কলেজের ছাত্রী থাকা কালিন সময় থেকেই প্রশংসিত হতে থাকেন সব শিক্ষক শিক্ষিকার কাছে। উচ্ছ্বল প্রাণবন্ত ব্যবহার, ক্লাশের শিক্ষার্থীদের প্রতি সহমর্মিতার জন্য তিনি হয়ে উঠলেন সবার প্রিয়। ২০১১ সালে এম.বি.বি.এস ডিগ্রী লাভ করেন। নিষ্ঠার সাথে সম্পন্ন করেন ইন্টার্নীর দীর্ঘ এক বছর। ইন্টার্নী শেষে যোগদান করলেন তাঁর নিজ মেডিকেল কলেজের এ্যানাটমী বিভাগের প্রভাষক হিসাবে।
এরপর মেডিকেল কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, নগরীর ল্যাব এইড হসপিটাল এবং মডার্ণ মেডিকেল কলেজ এ্যান্ড হসপিটালে। স্বপ্ন দেখতেন সার্জারী বিভাগের চিকিৎসক হবেন তিনি।
কিন্তু, সময়ের ডানায় ভর করে সেই স্বপ্ন পরিবর্তিত হয়। তিনি ২০১৪ সালে বি.সি.এস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। প্রথম পোস্টিং ছিল সিরাজগঞ্জে।
সিরাজগঞ্জের কামারখন্ড উপজেলায় কর্মরত থাকাকালিন সময়ে তিনি উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দৃষ্টিতে আসেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ স্যার এর তত্ত্বাবধানে ট্যালেন্ট হান্ট প্রোগ্রাম (স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে) আয়োজিত হয়। এই কর্মসূচীর আওতায় যাদের নেতৃত্বের ক্ষমতা রয়েছে, তাদের থেকে পুরো বাংলাদেশে দশ জন বি.সি.এস ক্যাডারকে নির্বাচন করা হয়। যারা নেতৃত্ব ও প্রযুক্তিতে বিশেষ দক্ষ। সারা দেশ থেকে দশ জন বি.সি.এস ক্যাডার নিয়ে কো-অর্ডিনেশান পলিসি প্ল্যানিং তৈরী করা হয়। সেই মেধাবী দশজনদের মাঝের একজন হলেন চিকিৎসক শিলা।
আমেরিকা ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ উদ্যোগে তিন মাস এর এক কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। ইউ.এস.এ.সি.ডি.সি (টঝঅ ঈবহঃবৎ ভড়ৎ উরংবধংব ঈড়হঃৎড়ষ) এর অধীনে তিন মাসের কর্মশালাতে অংশগ্রহণ করেন অসংখ্য চিকিৎসক।
এই কর্মশালাতে চিকিৎসক শিলা উপলব্ধি করেন, তিনি জনশক্তি বিষয়ক কাজে সংযুক্ত থাকলে, মানুষের উপকার করতে পারবেন বেশী। এই কর্মশালাতে আমেরিকা ও বাংলাদেশের উচ্চ পদস্থ জনশক্তির সংযোগ ঘটে।
এতে তিনি সবার নজর কাড়েন। নেতৃত্ব, ইংরেজীতে উপস্থাপনা, বন্ধু সুলভ আচরণের জন্য তিনি দেশ বিদেশের জনশক্তিদের কাছে সমাদৃত হন। এই কর্মসূচী বিশ্বের আরো ২২টা দেশে অনুষ্ঠিত হয়। এই কর্মসূচীর পর থেকে তিনি জনস্বাস্থ্য বিষয়ে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেন।
অ্যানথ্রাক্স এর উপরেও কাজ করেন তিনি।
সরকারি চাকরিতে যুক্ত হবার পর থেকেই উপলব্ধি করেন, বিদেশ থেকে উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করলে, তিনি আরো দক্ষ হবেন। দেশকে সেবা দিতে পারবেন আরো বেশী। চাকরির পাশাপাশি আই.ই.এল.টি.এস. করেন এবং ভালো স্কোর পেয়ে ফিনল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অফ ট্যামপেরিতে ডক্টরেট প্রোগ্রামে এপিডেমিওলজিতে পড়ার সুযোগ পান। ফিনল্যান্ডের এই ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সুযোগ পাবার জন্য ডাঃ শিলার সাথে তাঁর স্বামীও ফিনল্যান্ডে থাকবার অনুমতি পেয়েছেন।
১লা আগস্ট ২০১৭ থেকে শুরু তবে তাঁর ডক্টরেট ডিগ্রীর ক্লাস। তিনি একই সাথে ওয়ার্ল্ড হেল্থ অরগানাইজেশানের এক মাস ব্যাপী ক্যান্সার গবেষণার জন্য কর্মশালার উপরে ফ্রান্স এর বৃত্তি পান। আগামী জুন থেকে জুলাই পর্যন্ত এই কর্মশালা। ক্যান্সার নিরাময়, প্রতিকার, দ্রুত নির্ণয় এর বিষয়ে এক মাস ব্যাপী কর্মশালা এবং সম্প্রতি ইন্ডিয়ার মহালি থেকে এক মাসের (পাঞ্জাব) প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেন। তাঁর প্রশিক্ষণের বিষয় ছিল, “স্পেশালাইজ ট্রেইনিং প্রোগ্রাম ইন হেল্থ কেয়ার টেকনোলোজি ম্যানেজমেন্ট এ্যান্ড ক্লিনিকাল ইঞ্জিনীয়ারিং।”
বর্তমানে তিনি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তা। তাঁর এই সফলতার জন্য তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্ত্রী ও প্রসূতি বিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডাঃ আশরাফুন নেশা পিয়া এবং অধ্যাপক ফাতেমা আশরাফ ম্যাডামের নাম শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন।
তাঁর সহকর্মী চিকিৎসক রুবাইয়াত, চিকিৎসক আরাফাত, অস্ট্রেলিয়ার নিউ ক্যাসেল ইউনিভার্সিটির শিক্ষক চিকিৎসক মিলটনের কাছে ভীষণভাবে কৃতজ্ঞ। ডাঃ দিলীপ কুমার এর দিক নির্দেশনা তাঁর সফলতার জন্য বিশেষ অবদান রেখেছে।
তিনি তাঁর স্বামী সোহেল রানার প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে বলেন, “তাঁর এই সফলতার জন্য পরিবারের পাশাপাশি, স্বামীর অবদান অপরিহার্য্য। তিনি বলেন, “আমাদের সমাজে নারীরা যদি পরিবার ও শ্বশুর বাড়ীর সহযোগিতা সঠিকভাবে পায় তাহলে তারা আরো বেশী পরিমাণে সফল হবে।”
উন্নত বিশ্বে দেশের পতাকা ওড়ানোর স্বপ্ন দেখেন তিনি। জয় হোক ডাঃ শিলার। সাফল্যের মশাল হাতে তিনি এগিয়ে যান।
চিকিৎসক ও লেখক
ডাক্তার ফারহানা মোবিন
রেসিডেন্ট মেডিকেল অফিসার
গাইনী এন্ড অবস্
স্কয়ার হসপিটাল, ঢাকা












