গ্রীষ্মের প্রখর সূর্য এখনো তার পূর্ণ রূপ দেখায়নি, তবে মরুভূমির বাতাসে উত্তাপের আভাস মিলতে শুরু করেছে। আর এই আগাম গরমের ঝাপটা থেকে পথিকদের স্বস্তি দিতে কুয়েতের রাজপথে নেমে পড়েছেন একদল মানবতাবাদী মানুষ। কোনো বিনিময় নয়, কোনো প্রচার নয়—শুধুমাত্র সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টি আর আর্তমানবতার সেবায় তপ্ত দুপুরে তৃষ্ণার্থ পথচারী ও চালকদের হাতে তুলে দিচ্ছেন শীতল পানির বোতল। আরবের এই চিরচেনা রূপটি যেন রুক্ষ মরুভূমির বুকে এক পশলা শান্তির বৃষ্টি।
কুয়েতের বিভিন্ন মোড়ে মোড়ে এখন দেখা মিলছে এই দৃশ্য। সাদা ভ্যান থেকে নামিয়ে আনা হচ্ছে পানির প্যাকেট, আর হাসিমুখে তা বিলিয়ে দেওয়া হচ্ছে চেনা-অচেনা সবার মাঝে। আরব সংস্কৃতির এই মহানুভবতা নতুন কিছু নয়; যুগ যুগ ধরে তারা মেহমানদারি এবং জনকল্যাণমূলক কাজে বিশ্বের দরবারে ভূয়সী প্রশংসা কুড়িয়েছে। এটি কেবল পানি বিতরণ নয়, বরং ভ্রাতৃত্বের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। বলা হয়ে থাকে, আরব ভূমিতে ক্ষুধার্ত বা তৃষ্ণার্ত হয়ে কেউ প্রাণ হারায় না, কারণ সেখানে প্রতিটি ঘরই যেন এক একটি সেবাকেন্দ্র।

দুর্ভাগ্যবশত, এই সুন্দর দৃশ্যের সাথে যখন আমরা আমাদের প্রিয় স্বদেশের তুলনা করি, তখন একরাশ দীর্ঘশ্বাস এসে জমা হয়। বাংলাদেশে আমরা এমন মানবিকতার চরম বহিঃপ্রকাশ দেখেছিলাম চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের সেই অগ্নিঝরা দিনগুলোতে। তখন রাজপথের লড়াকু মানুষদের তৃষ্ণা মেটাতে নিজের জীবন বাজি রেখে পানি বিলিয়েছিলেন শহীদ মুগ্ধ। তার সেই ‘পানি লাগবে কারো পানি?’ ডাকটি হয়ে উঠেছিল মানবিকতার সর্বোচ্চ শিখর। কিন্তু সেই বিশেষ মুহূর্ত পার হওয়ার পর আমাদের রাজপথ থেকে যেন সেই নিঃস্বার্থ সেবার মানসিকতা আবার আড়ালে চলে গেছে।
আরব আর বাংলাদেশের মানবিক প্রেক্ষাপটে এখানেই বড় পার্থক্য। আরবে জনকল্যাণ কোনো বিশেষ পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে না, বরং এটি তাদের জীবনযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশ। অন্যদিকে আমাদের দেশে মানবিকতা অনেক সময় সংকটের ফ্রেমে বন্দী হয়ে থাকে। আরবের এই দৃষ্টান্ত আমাদের শিক্ষা দেয় যে, ভালো কাজের জন্য কোনো বিপ্লব বা সংকটের প্রয়োজন নেই; সদিচ্ছা থাকলে বছরের প্রতিটি দিনই মানুষের পাশে দাঁড়ানো সম্ভব। মরুভূমির তপ্ত বালুর ওপর দাঁড়িয়ে এই মানুষগুলো যে শীতল পানি বিলিয়ে দিচ্ছেন, তা আসলে হৃদয়ের উষ্ণতা দিয়ে গড়া এক অনন্য সেতুবন্ধন। কুয়েতের রাজপথের এই মানবিক দৃশ্যপট বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তের মানুষের জন্য এক উজ্জ্বল অনুপ্রেরণা।
আ হ জুবেদ (সম্পাদক -অগ্রদৃষ্টি)











