ডাঃ ফারহানা মোবিন:: সেই ২০০২ সালের কথা। আমার মেডিকেল কলেজের হোস্টেল জীবন। আমাদের মেডিকেল কলেজের
হোস্টেলটা খুব সুন্দর না হলেও এর ছাদটা খুব সুন্দর। রেলিংহীন ছাদ, আকাশ আর আমার মাঝে চলতো এই
ছাদের গভীর মিতালী। বুকভরে নেয়া যায় স্বস্তির নিঃশ্বাস। ছাদের মাঝে দাঁড়ালে মনে হতো যেন সমুদ্র
ক্সসকতে বসে আছি। কারণ, মাঝে কলেজ আর চারিদিকে বুড়ীগঙ্গার শাশ্বত বহমান ধারা। তবু সেই ধারাকে
শহর বানাতে চাইতো বর্ধমান জনতা। বুড়ীগঙ্গার দুই ধারেই দেখা যেত জীবনবৃত্তির জন্য জনতার তীব্র
প্রতিযোগিতা। নদীর পানি বাতাসের অকু ল ধাবমানতায় ছুটে চলতো। যখন সন্ধ্যাবেলা নদীবু কে পাল তোলা
নৌকা চলে আর সূর্য ডুবে যায় তখন আকাশে যে রঙের ছড়াছড়ি হয় তা সত্যিই বর্ণনাতীত। মনে হয় যেনÑ
আকাশে কেউ রঙের মেলা বসিয়েছে।
আমার কল্পনার আকাশেই সোনালী রূপার ¯্রে াতটা যেন হৃদয়ের নদীতে জোয়ার আনতো। সূর্যের সোনালী
রূপার আলো নৌকার পালগুলোকেও আচ্ছাদিত করে তোলে। নদীর ঘোলাটে পানি সূর্যের সোনালী বর্ণের
ছটায় বর্ণিল হয়ে যায়। সূর্যটা যখন ধীরে ধীরে নদীর সাথে মিশে যায়, ঠিক আমার মনের সব ব্যথাও সূর্যটার
সাথেই নদী মাঝে চলে যেত। মনটা হারিয়ে যেত আমার প্রশস্ত গভীরতার মাঝে। সূর্য ডোবার সাথেই যেন
গভীর ও গোপন যোগাযোগ হতো রাত্রির অন্ধকারে যা চারিদিক ঘিরে আতো আধার হয়ে।
ঘরে ঘরে জ্বলে উঠতো সভ্য যুগের বাতি, মেডিকেল ছাত্রীদের মোটা মোটা বই নিয়ে পড়া বা জটলা বাধিয়ে
আড্ডাবাজি। প্রতিদিন নিত্য নতুন স্বপ্নে অবগাহন করাটা ছিল আমাদের ব্রত। সংগ্রামের তুমুল প্রতিযোগিতা
মানুষের জীবনে এনে দেয় নতুন মাত্রা। কেউ ডুবে যেত কঙ্কাল আর বিশাল বই এর শ্বেত পৃষ্ঠায় আর কেউবা
মনমাঝি হয়ে বুড়ীগঙ্গার জলে ভাসাতো মহাকালের স্বপ্ন তরী। মহিলা হোস্টেলের প্রতিটা কক্ষে জ্বলে উঠতো
জ্ঞানের প্রদীপ। তবে কোন প্রদীপ নিভে যেত দ্রুত আর কোনটা জ্বলে সারা নিশি জীবিকার জ্বালানিতে।
প্রতিদিন প্রভাতে জেগে ওঠে এই মহিলা হোস্টেলের প্রাণ চাঞ্চল্য, সাবাই শ্রেণী কক্ষে যাবার প্রস্তুতি নিয়ে
উৎসুক চোখে বের হতাম জীবন-প্রাণের সন্ধানে। চলতে থাকতো ক্লাস। মরা-পঁচা-গলা মানুষের ব্যবচ্ছেদকরণ
আর কপোলে জমে যেত ঘামের কিছু বিন্দু। দুপুর গড়িয়ে আসতো বিকেল, শেষ হতো ক্লাস। ক্লান্ত দেহে যে
যার গন্তব্যস্থলে ফিরে যাত। হোস্টেলের কক্ষে তখন চলতো ক্লান্ত ছাত্রীদের ঘুমের প্রহর। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে যেন
স্বপ্ন দেখতামÑ মা বলতোÑ “কেমন আছে আমার সোনা, কতোদিন যে তোমাকে দেখিনি।” ক্লান্ত দেহটা পড়ে
থাকতো হোস্টেলের বিছানায়, আর মনটা আমার চলে যেত রাজশাহীর অলিগলির বিচিত্র অঙ্গনে। অনেক নতুন
অভিজ্ঞতা, বিচিত্র সব পরিস্থিতি আর বারো রকম মানুষের আনাগোনা ছিল এই হোস্টেলে। মানুষ যে কতো
স্বার্থপর আর বিচিত্র প্রকৃতির তা হোস্টেলে থাকলে আরো ভালভাবে উপলব্ধি করা যায়। অনেক নতুন
অভিজ্ঞতা, বিচিত্র সব মানুষের মন, নিত্য নতুন ঘটনার সূত্রপাত মস্তিষ্কের ধারণ ক্ষমতাকে যেন আরো
প্রসারিত করে তুলতো।
সন্ধ্যার বেলা চলতো প্রায় প্রতিটি রুমে চা পর্ব অর্থাৎ রাত্রি জেগে মোটা মোটা বই পড়ার প্রস্তুতি। ক্লান্ত দেহে
কড়া লিকারের এক কাপ চা যেন অমৃত!! কিছুক্ষণ চলতো হ-হা-হি-হি নইলে আফসোস হতো! কোন দুঃখে
যে মেডিকেল যে পড়তে এলাম, এতো পড়ার চাপ। মাঝে মাঝে ১ম বর্ষের কয়েকজন মিলে গাইতাম সন্ত্রাসী
এরশাদ শিকদারের সেই বিখ্যাত বিমর্ষতার গানÑ “আমিতো মরে যাবো, চলে যাবো, রেখে যাবো স্মৃতি এই
শিকদার মেডিকেল কলেজে।”
কলেজের ২য় তলায় মহিলা হোস্টেল আর ১ম তলায় ক্লাস হয়। ২য় তলায় ৩টা কুুকুর সারাদিন আর রাত
পাহাড়া দেয়। প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত না হয়েও মনে হয় যেন হোস্টেলের সবকিছু বোঝে। বিশেষ করে মেয়েদের প্রতি
তার অগাধ বিশ্বাস। মেয়েদের দেখে পার্শ্বে আসে কিছুক্ষণ ঘুরাফেরা করে আবার চলে যেত, কিন্তু ছেলেদের
দেখলেই করে চিৎকার। মাঝে মাঝে হোস্টেল সুপার উন্নতি ম্যাডাম কুকুরগুলোকে বকা দিতেন।
একদিন রাতে আমাদের এক বান্ধবী ফুলপ্যান্ট, শার্ট পরে বাইরে বের হলো, আর সাথে সাথেই শুরু হলো
কুকুরের তাড়া। কুকুরের দৃষ্টিভ্রম হয়েছিল। ভেবেছিলো সেটা বোধহয় কোন পুরুষ। কুকুরগুলো সারারাত
জেগে থাকতো। বুড়ীগঙ্গার তীর ঘেষে আমাদের কলেজে। কলেজের ডানে রয়েছে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের
বধ্যভূমি। রায়ের বাজারের এই বধ্যভূমি ৭১ এর যুদ্ধে এদেশের মানুষকে তাদের অম্লান আত্মত্যাগের কথা
মনে করিয়ে দেয়। সেই নির্বাক কালো স্তম্ভটা যেন হাজারো কথা বলে যায় আমাদের কানেÑ “শোন, তোমরা
স্বাধীন দেশের সন্তান, তোমরা আমাদের রক্তে বিনিময়ে এই কলেজ পেয়েছো। তোমরা আমাদের রক্তে মূল্য
দিও।
রাত্রে বেলা হেস্টেলের রেলিং এ দাঁড়াতাম। মনটা খুব খারাপ হলেÑ আকাশের তারাগুলোকে দেখতাম। সাদা
আকাশের মাঝে হাল্কা মেঘের আনাগোনা আর তারই মাঝে উজ্জ্বল হয়ে যেত জোৎ¯œার কিরণ। সাদার মেঘের
সাথে চাঁদটাও যেন ভেসে চলতো দূরদিগন্তপানে। রূপালী আভা মনের বিষন্নতা দূর করতো। নদীর মিষ্টি
বাতাস হোস্টেলের রেলিং ঘেষে যেত, কি যে ভালো লাগতো! মনে হতো প্রকৃতি তার রেশম কোমল হাত দিয়ে
আমার মুখে অপার ¯েœহ পরশ বুলিয়ে দিচ্ছে। দূরে গাবতলী বাস টার্মিনালের লাল নীল সবুজ হলুদ লাইটগুলো
জ্বলতো। দূর আকাশের তারার মতোই লাইটগুলো ঝিকিমিকি করতো। হারিয়ে যায় মনটা পুরনো স্মৃতিতে।
উদাস হয়ে যেতাম আমি। কলেজের প্রতিষ্ঠাতা শিকদার স্যারের বিশাল গগনচুম্বী অ্যাপার্ট মেন্ট রয়েছে।
সেখানে থাকলে মনে হয়Ñ চারিদিকে পানি আর মাঝে কলেজ। আমরা যেন সমুদ্র ক্সসকতে থাকি। বুড়ীগঙ্গার
এক ধারে উঁচু উঁচু বিল্ডিং আর অন্য ধারে ছিন্নমূল মানুষের বসতি। হোস্টেলের ছাদে বসে অনুভব করা যায়
দুইধারের জনবসতির মাঝে বিস্তর ব্যবধান।
হোস্টেলের পাশ ঘিরেই বিশাল হসপিটাল, শত শত রোগীদের রোগের সমাধান চলে এখানে। একদিন
হসপিটালের এ প্রান্তে চলে জন্মের প্রারম্ভ আর অন্যদিকে চলে জীবনাবসান। আর একউ বা সুস্থ হয়ে বাড়ী
ফিরে যায়, এটাই জীবন। পার্শ্বের বুড়ীগঙ্গার তীরে চলে জোড়া জোড়া প্রমিক-প্রেমিকার প্রতি বিকালের ভ্রমণ।
হোস্টেলের কড়া নিয়ম ভঙ্গ করে তারা চলে যায়Ñ হৃদয়ের ক্ষুধা নিবারণে। মাঝে মাঝে চলে কলেজের পেয়ারা
গাছ হতে পেয়ারা চুরির পালা।
সুবিধার বারিধারা রইলেও মনে পড়তো আমার মায়ের কথা, ভাইবোনের কথা, আপনজনদের কথা, রাজশাহীর
কোন এক গৃহকোণে তারা ছিল অবস্থ ানরত। সময় নেই আজ তাদের সাথে গল্প করার আর বেড়াবার, ঢাকার
এই যান্ত্রিকতায় আমিও হবোÑ “চিকিৎসক নামের যন্ত্র”। এটাই তখন ভাবতাম। আজ আমি চিকিৎসক, ভীষণ
ব্যস্ততাই আমার জীবন।
সুখ-দুঃখ-ব্যথা নিয়েই ছিল আমাদের এই শিকদার মেডিকেল কলেজ। আমার পেশা জীবনের প্রথম ধাপ।
নতুন অভিজ্ঞাতা আর নতুন পথ চলার স্থান ছিল সেটি। ভালো লাগুক বা নাই বা লাগুক ঐ বুড়ীগঙ্গার বহমান
¯্রােতের মতো পূর্ব পরিচিত মানুষদের ছেড়ে আমাকে যেতে হবে আরো দূরে………. আরো দূরে। সারা জীবন
এই প্রতীজ্ঞা করেছি। আজ বিখ্যাত কবি রবার্ট ফ্রস্টের ভাষায় আমিও বলতে চাই…..
ডাঃ ফারহানা মোবিন
মেডিকেল অফিসার, গাইনী এ্যান্ড অবস,
স্কয়ার হসপিটাল, ঢাকা।











