Menu |||

বাবাকে লেখা চিঠি- আরিফ চৌধুরী শুভ

সকালের সূর্যটা অপূর্ব ঝিলমিল আলোয় জ্বলছে । ঝিলমিল আলোর ঝলকানিতে গাছের পাতাগুলো কেমন যেন প্রাণের পরশে আন্দোলিত । কচিকচি পাতার ফাঁকে দোয়েল ,ময়না , চড়ুই ,শালিক পরষ্পরের সাথে সুরের লুকুচুরি খেলায় মত্ত। পুকুরের জলে সৃষ্ট সোনা রোদের রশ্মি রেখায় চোখ ঝলসে উঠে। সমুদ্রের বাঁধ ভাঙা ঢেউগুলো অবিরাম এসে দোল খাচ্ছে কিনারায়। দূর সমুদ্রের মাঝে লাল আলোর সূর্যটা কিছুক্ষণ আগে ঠিক যেন প্রকৃতিকে এই রকমই জাগিয়েছে। হঠাৎ এক টুকরো কালো মেঘ স্বচ্ছ আলোকে মৃয়মান করে দিলো।
দিনটি শ্রাবনের নয় ,তবুও আজ সারা বেলায় আকাশে মেঘের বিচরণ। কালো মেঘের রাজ্যে আজ মনে হচ্ছে আর এক মিনিটের জন্যও রোদ্দুর ঠাঁই নেই। একটু পরেই ঝিম ধরে বৃষ্টির মাতলামি। থেমে থেমে বৃষ্টি যেন পুরো দিনটাকে সাঁঝের কিনারায় নিয়ে এলো। চারদিকে সাঁঝের আঁধার জাগ্রত প্রকৃতিকে ঘরে ফেরার তগিদ দিচ্ছে পুরানো ঢঙে। তবুও এখনো বৃষ্টি থামার নাম গন্ধ নেই । ক্লান্ত পাখির দল মেঘ সাঁতরে নীড়ে ফিরে যাচ্ছে। দূর মাঠে রাখাল বেবুজ বাঁশির সুর থামিয়ে গরুর পাল নিয়ে বাড়ি ফিরছে কাঁদামাটি মাড়িয়ে।
গোধুলীলগ্নে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আমি, আকাশের দিকে পলকহীন চোখজোড়া দিয়ে তাকিয়ে আছি। বাবাকে আজ বড্ড মনে পড়ছে। ছেলেবেলায় বৃষ্টি দেখলে বই খাতা ছেড়ে বাবার কাছে বায়না ধরতাম গল্প শুনার জন্যে। সাথে মাকে বলতাম সাদা চালের খিচুড়ি রান্না করার জন্যে। গল্পের ফাঁকে ফাঁকে খিচুড়িতে মুখ দিয়ে সময় কাটতো।
আজ খুব ইচ্ছে করছে এমন বর্ষনমুখর দিনে বাবার মুখের গল্প শুনতে। গোপীবাগা, কুটুম পাখি, সাতরাজার ধন এক মানিক, হীরক রাজার রাজত্ব, পরীর দিঘীর কাহিনী, সাপের মুখে মানিক, ঠাকুরমার ঝুলি, আনারস কাঁঠাল এবং বাবার মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত অনেক গল্প ও কাহিনী। গল্পের ফাঁকে ফাঁকে কখনো কখনো উঁকি মারতো একটু চোখের জল।
বৃষ্টির প্রতিটি ফোটা যেন আজ বাবার হাতকে স্পর্শ করতে চায়। ঐ নীল চোখ ধ্রুবতারার দিকে তাকিয়ে বাবার মুখের গল্প শুনতে চায়। কিন্তু তা যেন আজ আর হওয়ার নয়। ২০১২ সালের ২৪ মে পড়ন্ত বিকেলে এক অপ্রত্যাশিত দূর্ঘটনায় আমাকে ছেড়ে (ডা. মোমতাজ উদ্দিন আহাম্মদ) চলে গেলেন না ফেরার দেশে। বাবা যে আজ আমার থেকে অনেক দূরে । এই বৃষ্টি, এই সূর্য, এই নক্ষত্র বিহীন কোন অজানায়।
কিন্তু এই অবুজ মনকে কে বুঝাবে? ফ্রেমে বাঁধা বাবার ছবি ঝুলে আছে দেয়ালে। সেই হাসিমাখা মুখ, টান টান চোখের ছাউনি। মুখ জুড়ে ছড়িয়ে আছে এক অসীম মায়া, ¯েœহ আর ভালোবাসা। দেখলে মনে হয় না বাবা আমার অভিমান করে আমায় ছেড়ে দূরে চলে গেছে অনেক দূরে। কিন্তু এ যেন বাস্তবতা। কেমন করে পারলে বাবা? কেমন করে পারলে?
এখন আর কেউ প্রত্যাহ রাত ১১টায় গঞ্জ থেকে এসে আরিফ বলে ডাক দেয় না। বাজার থেকে ডিমওয়ালা ইলিশ মাছ এনে কেউ সামনে দাঁড়ায় না। দাঁড়ায় না এক ঝলক হাসি আর না বলা গল্পের কাহিনী শুনাতে।
বাবা তুমি কি আজ তোমার আরিফকে দেখতে পাও? বৃষ্টির রাজত্বে আজ ঘাসের বুকে শিশিরের দল ঠাঁই পাইনি। আঁধারের পথ ধরে বাদুড়ের দল ডানা মেলে উড়ে যাচ্ছে না পেয়ারা বনে। মধ্য রাতের ভূতুম পেঁচার ডাক যেন বিষন্নতার আকাশ ছঁই না। কালো মেঘের আড়ালে কলঙ্কহীন চাঁদের আলো মায়াজাল সৃষ্টি করছে। এক অজানা কষ্ট ঘিরে রেখেছে আমার মনের চারপাশে। সব আগের মতোই আছে । শুধু বাবা নেই।
নিশিথ স্বপ্নের স্বাদ যেন স্বর্গের নিমন্ত্রন। আজ আমি সেই স্বপ্ন ভেঙে নিশি ফোটা ফুলের সঙে রাত জেগে বাবার কাছে চিঠি লিখি। বাতাসে উড়িয়ে দিই আকাশের ঠিকানায়। প্রতি বছর ১৬ই জুন বাবা দিবসে বাবা তোমার প্রতি রইল আমার অকৃত্রিম ভালোবাসা আর তোমাকে না পাওয়ার কষ্টে জমানো অশ্রু গড়ানো জল।
রাত ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে। এক সময় মেঝেতে লুটিয়ে পড়ি বাবাকে দেখার স্বপ্নে। বুকের মাঝে চেপে ধরি বাবার ছবিটাকে।
বাবা তুমি লুকিয়ে আছ কোন অজানার মাঝে
স্বর্গ নরক তোমায় খুঁজি সকাল বিকাল সাঁঝে।

তারিখঃ২৪/০৫/২০১৩ইং

মুরহুম ডা. মোমতাজ উদ্দিন আহামেদ(১৯৪৩-২০১২)

অত:পর আমি
প্রতিটি মানুষ এই পৃথিবীতে আসে চিরচারিত স্বাভাবিক নিয়মে। আবার মৃত্যু নামক শব্দের মধ্য দিয়ে এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যায় চিরদিনের জন্য। এরই মধ্যে কিছু মানুষের কর্ম তাকে করে পরিচিত, আলোচিত এবং সমালোচিত। কর্ম দ্বারাই কেউ হন বিখ্যাত। ত্যাগের মহিমায় মহিমান্বিত হয়ে হয়ে উঠেন অসাধারণ। তখন সেই মানুষটি আর ব্যক্তি আমির মধ্যে সীমাবদ্ব থাকেন না। হয়ে যান তথাকথিত পরিবার, সমাজ কিংবা রাষ্ট্রের সম্পদ। আর তাঁদের এই ব্যক্তিত্ব আমিকে অতিক্রম করার পেছনে রয়েছে বহু ত্যাগ সাধনা একগ্রতা। তেমনি স্বনামে বিশিষ্ট্য ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠার মধ্য দিয়ে আমাদের মাঝ থেকে প্রয়াত ডা. মোমতাজ উদ্দিন আহামেদের সংক্ষিপ্ত জীবন বৃত্তান্ত নি¤েœ তুলে ধরা হলো।
মুরহুম ডা. মোমতাজ উদ্দিন আহামেদ ১৯৪৩ সালের ২৩ শে অগাস্ট লক্ষীপুর জেলার অন্তর্গত গন্ধব্যপুর গ্রামে সমভ্রান্ত এক মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহন করে। বাবা মুরহুম ডা. আনোয়ারুল হক, মাতা মুরহুমা ছলেমা বেগম। পাঁচ ভাই বোনের মধ্যে তিঁনি সবার ছোট। ছোটবেলা থেকে দুরন্ত ও মেধাবী হওয়ায় পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণীতে বৃত্তি লাভসহ ১৯৫৮ সালে লক্ষীপুর মডেল স্কুল (বর্তমানে অর্দশ সামাদ) থেকে প্রথম বিভাগে এন্ট্রাস পাশ করেন। একই ধারাবাহিকতায় ১৯৬০ সালে মাইজদী কলেজ থেকে প্রথম বিভাগে আই এস সি পাশ করেন। এবং পরবর্তিতে ১৯৬৩ সালে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে দ্বিতীয় বিভাগে বি এ উর্ত্তীণ হন।
ছাত্রজীবনের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে পেশা জীবন শুরু করলেও পরবর্তীতে চিকিৎসা সেবায় আত্মনিয়োগ করেন। চাকরির সুবাদে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল বিশেষ করে চট্রগ্রামের আঞ্চলিকতাতে তাঁর দক্ষতা ছিলো অটুট। ছাত্রজীবনে বিভিন্ন আন্দোলনের পাশাপাশি স্বাধীনতা আন্দোলনে তাঁর অংশগ্রহন ছিলো স্বত:পূর্ত ও অগ্রভাগে। দেশমাতৃকাকে রক্ষা করতে গিয়ে সেদিন প্রতিপক্ষের গুলিতে বাম পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন তিঁনি। চট্রগ্রাম থাকা কালিন সময়ে ১৯৬৫ সালে চিকিৎসা শাস্ত্রের উপর ডিগ্রি নেন এবং পরবতীর্তে ভারত থেকে উন্নতর প্রশিক্ষন নেন।
১৯৭৫ সালে পল্লীচিকিৎসার প্রশিক্ষক হিসাবে পরিচিতি লাভ করেন এবং নিজ গ্রাম গন্ধব্যপুরের পাশাপাশি মান্দারী, ঝকসিন, দাশের হাঁট, শান্তির হাঁট, পুকুরদিয়া, হাজিগঞ্জ, তেয়ারীগঞ্জ, তোরাবগঞ্জ, রামগতি এবং ফরাশগঞ্জে চেম্বারের মাধ্যমে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা প্রধান করেন।
১৯৭৫ সালের ১৩ই জানুয়ারী চাঁদপুরে মাও: ছায়েদ নুরি এবং ডা. ছকিনা বেগমের একমাত্র মেয়ে ফাতেমা আক্তার (মানিক) এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। চিকিৎসার খাতিরে স্বাধীনতার পরপরই ফরাশগনজে স্থায়ী ভাবে বসবাস শুরু করেন এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিঁনি এই গ্রামেই চিকিৎসাসেবা দিয়ে গেছেন।
উন্নত চিকিৎসা সেবা প্রধানের জন্য বিভিন্ন সংগঠনের দেওয়া সার্টিফিকিট আর পুরস্কার তাঁর ঝুলিতে যেমনি কম ছিলো না, তেমনি চিকিৎসা সাস্ত্রের পাশাপাশি শিক্ষাক্ষেত্রেও তাঁর অবদান অপূরনীয়।
সামাজিক শিক্ষা প্রসারের লক্ষে ১৯৮৬ সালে ফরাশগঞ্জে মুনছুর আহাম্মদ উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত করার জন্য ৭৮ শতাংশ জমি দান করেন। লক্ষীপুর নগর ক্লিনিক প্রতিষ্ঠার পেছনেও তার অবদান রয়েছে। শুধু তাই নয়, তিঁনি তাঁর জীবদর্শায় আনসার ভিডিপি ক্লাবের মত সরকারি ও বেসরকারি নানা সংগঠনের সাথে সরাসরি জড়িত ছিলেন।
গ্রামীন শিক্ষা ও উন্নয়নের প্রতীক এই মহান ব্যক্তিটি ২০১২ সালের ২৪ ই মে একটি অনাকাঙ্খিত গাছ দুর্ঘঠনায় নিজ বাড়িতে মৃত্যু বরণ করেন ( ইন্নালিল্লাহে…………)।
ফরাশগঞ্জের পারিবারিক কবরাস্থানে তাঁকে সমাহিত করা হয়। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিলো প্রায় ৭০ বছর। মৃত্যু কালে স্ত্রী সন্তানসহ অসংখ্য গুনিজন ও বক্তদের রেখে গেছেন। তাঁর সন্তানেরা স্বস্থানে শিক্ষিত ও মার্যাদা সম্পুন্ন। তাঁর এক ছেলে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে ডিগ্রি নিয়েছেন।
আল্লাহ তাঁর আত্মার শান্তি দান করুন।
Facebook Comments

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



» কুয়েত প্রবাসী বাংলাদেশীরা নানা কারণে উদ্বিগ্ন

» মৌলভীবাজারে ফ্রন্টলাইন ফাইটার ডাঃ ফয়ছল

» ছুটিতে গিয়ে আটকে পড়া কুয়েত প্রবাসী বাংলাদেশীদের অনলাইন নিবন্ধন

» ভারতে এক দিনে রেকর্ড ৯৭,৮৯৪ রোগী শনাক্ত

» পেঁয়াজ রপ্তানি ফের চালু করতে বাংলাদেশের চিঠি

» ttt

» করোনায় বিশ্বের অগ্রগতি ২০ বছর পিছিয়ে গেছে: গেটস ফাউন্ডেশন

» অভিনেতা মহিউদ্দিন বাহার আর নেই

» কুয়েতে করোনাভাইরাস এর সর্বশেষ সংবাদ- ১৪/০৯/২০২০

» ঢাকায় হাসপাতাল থেকে ‘লাফিয়ে’ বিদেশির মৃত্যু

Agrodristi Media Group

Advertising,Publishing & Distribution Co.

Editor in chief & Agrodristi Media Group’s Director. AH Jubed
Legal adviser. Advocate Musharrof Hussain Setu (Supreme Court,Dhaka)
Editor in chief Health Affairs Dr. Farhana Mobin (Square Hospital, Dhaka)
Social Welfare Editor: Rukshana Islam (Runa)

Head Office

Mahrall Commercial Complex. 1st Floor
Office No.13, Mujamma Abbasia. KUWAIT
Phone. 00965 65535272
Email. agrodristi@gmail.com / agrodristitv@gmail.com

Desing & Developed BY PopularITLtd.Com
,

বাবাকে লেখা চিঠি- আরিফ চৌধুরী শুভ

সকালের সূর্যটা অপূর্ব ঝিলমিল আলোয় জ্বলছে । ঝিলমিল আলোর ঝলকানিতে গাছের পাতাগুলো কেমন যেন প্রাণের পরশে আন্দোলিত । কচিকচি পাতার ফাঁকে দোয়েল ,ময়না , চড়ুই ,শালিক পরষ্পরের সাথে সুরের লুকুচুরি খেলায় মত্ত। পুকুরের জলে সৃষ্ট সোনা রোদের রশ্মি রেখায় চোখ ঝলসে উঠে। সমুদ্রের বাঁধ ভাঙা ঢেউগুলো অবিরাম এসে দোল খাচ্ছে কিনারায়। দূর সমুদ্রের মাঝে লাল আলোর সূর্যটা কিছুক্ষণ আগে ঠিক যেন প্রকৃতিকে এই রকমই জাগিয়েছে। হঠাৎ এক টুকরো কালো মেঘ স্বচ্ছ আলোকে মৃয়মান করে দিলো।
দিনটি শ্রাবনের নয় ,তবুও আজ সারা বেলায় আকাশে মেঘের বিচরণ। কালো মেঘের রাজ্যে আজ মনে হচ্ছে আর এক মিনিটের জন্যও রোদ্দুর ঠাঁই নেই। একটু পরেই ঝিম ধরে বৃষ্টির মাতলামি। থেমে থেমে বৃষ্টি যেন পুরো দিনটাকে সাঁঝের কিনারায় নিয়ে এলো। চারদিকে সাঁঝের আঁধার জাগ্রত প্রকৃতিকে ঘরে ফেরার তগিদ দিচ্ছে পুরানো ঢঙে। তবুও এখনো বৃষ্টি থামার নাম গন্ধ নেই । ক্লান্ত পাখির দল মেঘ সাঁতরে নীড়ে ফিরে যাচ্ছে। দূর মাঠে রাখাল বেবুজ বাঁশির সুর থামিয়ে গরুর পাল নিয়ে বাড়ি ফিরছে কাঁদামাটি মাড়িয়ে।
গোধুলীলগ্নে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আমি, আকাশের দিকে পলকহীন চোখজোড়া দিয়ে তাকিয়ে আছি। বাবাকে আজ বড্ড মনে পড়ছে। ছেলেবেলায় বৃষ্টি দেখলে বই খাতা ছেড়ে বাবার কাছে বায়না ধরতাম গল্প শুনার জন্যে। সাথে মাকে বলতাম সাদা চালের খিচুড়ি রান্না করার জন্যে। গল্পের ফাঁকে ফাঁকে খিচুড়িতে মুখ দিয়ে সময় কাটতো।
আজ খুব ইচ্ছে করছে এমন বর্ষনমুখর দিনে বাবার মুখের গল্প শুনতে। গোপীবাগা, কুটুম পাখি, সাতরাজার ধন এক মানিক, হীরক রাজার রাজত্ব, পরীর দিঘীর কাহিনী, সাপের মুখে মানিক, ঠাকুরমার ঝুলি, আনারস কাঁঠাল এবং বাবার মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত অনেক গল্প ও কাহিনী। গল্পের ফাঁকে ফাঁকে কখনো কখনো উঁকি মারতো একটু চোখের জল।
বৃষ্টির প্রতিটি ফোটা যেন আজ বাবার হাতকে স্পর্শ করতে চায়। ঐ নীল চোখ ধ্রুবতারার দিকে তাকিয়ে বাবার মুখের গল্প শুনতে চায়। কিন্তু তা যেন আজ আর হওয়ার নয়। ২০১২ সালের ২৪ মে পড়ন্ত বিকেলে এক অপ্রত্যাশিত দূর্ঘটনায় আমাকে ছেড়ে (ডা. মোমতাজ উদ্দিন আহাম্মদ) চলে গেলেন না ফেরার দেশে। বাবা যে আজ আমার থেকে অনেক দূরে । এই বৃষ্টি, এই সূর্য, এই নক্ষত্র বিহীন কোন অজানায়।
কিন্তু এই অবুজ মনকে কে বুঝাবে? ফ্রেমে বাঁধা বাবার ছবি ঝুলে আছে দেয়ালে। সেই হাসিমাখা মুখ, টান টান চোখের ছাউনি। মুখ জুড়ে ছড়িয়ে আছে এক অসীম মায়া, ¯েœহ আর ভালোবাসা। দেখলে মনে হয় না বাবা আমার অভিমান করে আমায় ছেড়ে দূরে চলে গেছে অনেক দূরে। কিন্তু এ যেন বাস্তবতা। কেমন করে পারলে বাবা? কেমন করে পারলে?
এখন আর কেউ প্রত্যাহ রাত ১১টায় গঞ্জ থেকে এসে আরিফ বলে ডাক দেয় না। বাজার থেকে ডিমওয়ালা ইলিশ মাছ এনে কেউ সামনে দাঁড়ায় না। দাঁড়ায় না এক ঝলক হাসি আর না বলা গল্পের কাহিনী শুনাতে।
বাবা তুমি কি আজ তোমার আরিফকে দেখতে পাও? বৃষ্টির রাজত্বে আজ ঘাসের বুকে শিশিরের দল ঠাঁই পাইনি। আঁধারের পথ ধরে বাদুড়ের দল ডানা মেলে উড়ে যাচ্ছে না পেয়ারা বনে। মধ্য রাতের ভূতুম পেঁচার ডাক যেন বিষন্নতার আকাশ ছঁই না। কালো মেঘের আড়ালে কলঙ্কহীন চাঁদের আলো মায়াজাল সৃষ্টি করছে। এক অজানা কষ্ট ঘিরে রেখেছে আমার মনের চারপাশে। সব আগের মতোই আছে । শুধু বাবা নেই।
নিশিথ স্বপ্নের স্বাদ যেন স্বর্গের নিমন্ত্রন। আজ আমি সেই স্বপ্ন ভেঙে নিশি ফোটা ফুলের সঙে রাত জেগে বাবার কাছে চিঠি লিখি। বাতাসে উড়িয়ে দিই আকাশের ঠিকানায়। প্রতি বছর ১৬ই জুন বাবা দিবসে বাবা তোমার প্রতি রইল আমার অকৃত্রিম ভালোবাসা আর তোমাকে না পাওয়ার কষ্টে জমানো অশ্রু গড়ানো জল।
রাত ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে। এক সময় মেঝেতে লুটিয়ে পড়ি বাবাকে দেখার স্বপ্নে। বুকের মাঝে চেপে ধরি বাবার ছবিটাকে।
বাবা তুমি লুকিয়ে আছ কোন অজানার মাঝে
স্বর্গ নরক তোমায় খুঁজি সকাল বিকাল সাঁঝে।

তারিখঃ২৪/০৫/২০১৩ইং

মুরহুম ডা. মোমতাজ উদ্দিন আহামেদ(১৯৪৩-২০১২)

অত:পর আমি
প্রতিটি মানুষ এই পৃথিবীতে আসে চিরচারিত স্বাভাবিক নিয়মে। আবার মৃত্যু নামক শব্দের মধ্য দিয়ে এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যায় চিরদিনের জন্য। এরই মধ্যে কিছু মানুষের কর্ম তাকে করে পরিচিত, আলোচিত এবং সমালোচিত। কর্ম দ্বারাই কেউ হন বিখ্যাত। ত্যাগের মহিমায় মহিমান্বিত হয়ে হয়ে উঠেন অসাধারণ। তখন সেই মানুষটি আর ব্যক্তি আমির মধ্যে সীমাবদ্ব থাকেন না। হয়ে যান তথাকথিত পরিবার, সমাজ কিংবা রাষ্ট্রের সম্পদ। আর তাঁদের এই ব্যক্তিত্ব আমিকে অতিক্রম করার পেছনে রয়েছে বহু ত্যাগ সাধনা একগ্রতা। তেমনি স্বনামে বিশিষ্ট্য ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠার মধ্য দিয়ে আমাদের মাঝ থেকে প্রয়াত ডা. মোমতাজ উদ্দিন আহামেদের সংক্ষিপ্ত জীবন বৃত্তান্ত নি¤েœ তুলে ধরা হলো।
মুরহুম ডা. মোমতাজ উদ্দিন আহামেদ ১৯৪৩ সালের ২৩ শে অগাস্ট লক্ষীপুর জেলার অন্তর্গত গন্ধব্যপুর গ্রামে সমভ্রান্ত এক মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহন করে। বাবা মুরহুম ডা. আনোয়ারুল হক, মাতা মুরহুমা ছলেমা বেগম। পাঁচ ভাই বোনের মধ্যে তিঁনি সবার ছোট। ছোটবেলা থেকে দুরন্ত ও মেধাবী হওয়ায় পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণীতে বৃত্তি লাভসহ ১৯৫৮ সালে লক্ষীপুর মডেল স্কুল (বর্তমানে অর্দশ সামাদ) থেকে প্রথম বিভাগে এন্ট্রাস পাশ করেন। একই ধারাবাহিকতায় ১৯৬০ সালে মাইজদী কলেজ থেকে প্রথম বিভাগে আই এস সি পাশ করেন। এবং পরবর্তিতে ১৯৬৩ সালে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে দ্বিতীয় বিভাগে বি এ উর্ত্তীণ হন।
ছাত্রজীবনের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে পেশা জীবন শুরু করলেও পরবর্তীতে চিকিৎসা সেবায় আত্মনিয়োগ করেন। চাকরির সুবাদে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল বিশেষ করে চট্রগ্রামের আঞ্চলিকতাতে তাঁর দক্ষতা ছিলো অটুট। ছাত্রজীবনে বিভিন্ন আন্দোলনের পাশাপাশি স্বাধীনতা আন্দোলনে তাঁর অংশগ্রহন ছিলো স্বত:পূর্ত ও অগ্রভাগে। দেশমাতৃকাকে রক্ষা করতে গিয়ে সেদিন প্রতিপক্ষের গুলিতে বাম পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন তিঁনি। চট্রগ্রাম থাকা কালিন সময়ে ১৯৬৫ সালে চিকিৎসা শাস্ত্রের উপর ডিগ্রি নেন এবং পরবতীর্তে ভারত থেকে উন্নতর প্রশিক্ষন নেন।
১৯৭৫ সালে পল্লীচিকিৎসার প্রশিক্ষক হিসাবে পরিচিতি লাভ করেন এবং নিজ গ্রাম গন্ধব্যপুরের পাশাপাশি মান্দারী, ঝকসিন, দাশের হাঁট, শান্তির হাঁট, পুকুরদিয়া, হাজিগঞ্জ, তেয়ারীগঞ্জ, তোরাবগঞ্জ, রামগতি এবং ফরাশগঞ্জে চেম্বারের মাধ্যমে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা প্রধান করেন।
১৯৭৫ সালের ১৩ই জানুয়ারী চাঁদপুরে মাও: ছায়েদ নুরি এবং ডা. ছকিনা বেগমের একমাত্র মেয়ে ফাতেমা আক্তার (মানিক) এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। চিকিৎসার খাতিরে স্বাধীনতার পরপরই ফরাশগনজে স্থায়ী ভাবে বসবাস শুরু করেন এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিঁনি এই গ্রামেই চিকিৎসাসেবা দিয়ে গেছেন।
উন্নত চিকিৎসা সেবা প্রধানের জন্য বিভিন্ন সংগঠনের দেওয়া সার্টিফিকিট আর পুরস্কার তাঁর ঝুলিতে যেমনি কম ছিলো না, তেমনি চিকিৎসা সাস্ত্রের পাশাপাশি শিক্ষাক্ষেত্রেও তাঁর অবদান অপূরনীয়।
সামাজিক শিক্ষা প্রসারের লক্ষে ১৯৮৬ সালে ফরাশগঞ্জে মুনছুর আহাম্মদ উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত করার জন্য ৭৮ শতাংশ জমি দান করেন। লক্ষীপুর নগর ক্লিনিক প্রতিষ্ঠার পেছনেও তার অবদান রয়েছে। শুধু তাই নয়, তিঁনি তাঁর জীবদর্শায় আনসার ভিডিপি ক্লাবের মত সরকারি ও বেসরকারি নানা সংগঠনের সাথে সরাসরি জড়িত ছিলেন।
গ্রামীন শিক্ষা ও উন্নয়নের প্রতীক এই মহান ব্যক্তিটি ২০১২ সালের ২৪ ই মে একটি অনাকাঙ্খিত গাছ দুর্ঘঠনায় নিজ বাড়িতে মৃত্যু বরণ করেন ( ইন্নালিল্লাহে…………)।
ফরাশগঞ্জের পারিবারিক কবরাস্থানে তাঁকে সমাহিত করা হয়। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিলো প্রায় ৭০ বছর। মৃত্যু কালে স্ত্রী সন্তানসহ অসংখ্য গুনিজন ও বক্তদের রেখে গেছেন। তাঁর সন্তানেরা স্বস্থানে শিক্ষিত ও মার্যাদা সম্পুন্ন। তাঁর এক ছেলে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে ডিগ্রি নিয়েছেন।
আল্লাহ তাঁর আত্মার শান্তি দান করুন।
Facebook Comments


এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



আজকের দিন-তারিখ

  • রবিবার (রাত ২:৫৩)
  • ২০শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ
  • ২রা সফর, ১৪৪২ হিজরি
  • ৫ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ (শরৎকাল)

Exchange Rate

Exchange Rate: EUR

সর্বশেষ খবর



Agrodristi Media Group

Advertising,Publishing & Distribution Co.

Editor in chief & Agrodristi Media Group’s Director. AH Jubed
Legal adviser. Advocate Musharrof Hussain Setu (Supreme Court,Dhaka)
Editor in chief Health Affairs Dr. Farhana Mobin (Square Hospital, Dhaka)
Social Welfare Editor: Rukshana Islam (Runa)

Head Office

Mahrall Commercial Complex. 1st Floor
Office No.13, Mujamma Abbasia. KUWAIT
Phone. 00965 65535272
Email. agrodristi@gmail.com / agrodristitv@gmail.com

Bangladesh Office

Director. Rumi Begum
Adviser. Advocate Koyes Ahmed
Desk Editor (Dhaka) Saiyedul Islam
44, Probal Housing (4th floor), Ring Road, Mohammadpur,
Dhaka-1207. Bangladesh
Contact: +8801733966556 / +8801920733632

Email Address

agrodristi@gmail.com, agrodristitv@gmail.com

Licence No.

MC- 00158/07      MC- 00032/13

Design & Devaloped BY Popular-IT.Com
error: Content is protected !!