বাংলাদেশে বর্তমান সময়ে বাহ্যিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন চোখে পড়ার মতো হলেও, একটি মৌলিক জায়গায় আমরা এখনো বেশ অন্ধকারের মধ্যেই রয়ে গেছি; আর তা হলো খাদ্য নিরাপত্তা এবং সাধারণ মানুষের সচেতনতা। চারপাশের সামগ্রিক পরিস্থিতি অবলোকন করলে বারবার মনে হয়, আমাদের দেশ ও জাতি উন্নত বিশ্বের চেয়ে এখনো শতগুণ পিছিয়ে রয়েছে, যার মূল কারণ অসতর্কতা এবং সচেতনতার চরম অভাব।
উন্নত দেশগুলোতে যেখানে ফুড সেফটিকে নাগরিকদের মৌলিক অধিকারের প্রধান শর্ত হিসেবে দেখা হয়, সেখানে আমাদের দেশে এটি এখনো এক প্রকার অবুঝ শিশুর মতোই অবহেলিত। অথচ দেশের রুচিশীল মানুষ যখন কোনো নামী কিংবা ভালো মানের রেস্তোরাঁয় খাবার খেতে যান, তখন তারা কিন্তু কেবল নিজেকে বড় করে দেখানোর জন্য যান না; বরং সেখানে যাওয়ার মূল কারণ হলো স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ ও শতভাগ খাদ্য নিরাপত্তার নিশ্চয়তা। কিন্তু সর্বস্তরে এই নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করতে আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রকে প্রথমেই বুঝতে হবে যে, কেন স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ ও খাদ্য নিরাপত্তা রক্ষা করা এতোটা জরুরি।
একটি শীর্ষস্থানীয় ডায়েট ফুড কোম্পানির সিনিয়র কোয়ালিটি কন্ট্রোল সুপারভাইজার হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা এবং বর্তমানে ‘সুইং ডায়েট ফুড’ নামের প্রতিষ্ঠানে ফুড কোয়ালিটি কন্ট্রোল ম্যানেজারের গুরুদায়িত্ব সামলানোর বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, এই খাতে প্রতিদিন একেকটি নতুন চ্যালেঞ্জ সামনে এসে দাঁড়ায়। তবে এই চ্যালেঞ্জকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করে কাজ করার পেছনে রয়েছে একটি বিশেষ পেশাগত শক্তি, আর তা হলো সাংবাদিকতা। অত্যন্ত চমৎকার একটি বিষয় হলো, খাদ্য নিয়ন্ত্রক হিসেবে দায়িত্ব পালনের নিয়মগুলোর সাথে সাংবাদিকতার কাঠামোর এক অদ্ভুত মিল রয়েছে।
সাংবাদিকতায় যেমন একটি ঘটনার পেছনে ‘কী হয়েছে, কেন হয়েছে এবং এর কারণ কী’—এইসব খুঁটিনাটি বিবরণ ও প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হয়; ঠিক তেমনি ফুড নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানকেও কঠোরভাবে অবজারভেশন (Observation), রুট অব কজ (Root of cause) এবং কারেক্টিভ অ্যাকশন (Corrective action) ইত্যাদি বিষয়গুলো নিখুঁতভাবে অনুসরণ করতে হয়। একজন গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে বাস্তব ঘটনার পেছনের সত্য উন্মোচনের যে তাড়না থাকে, ঠিক সেই একই দূরদৃষ্টি কাজে লাগিয়ে খাদ্য নিরাপত্তার ভুলত্রুটিগুলো চিহ্নিত করা এবং তা সংশোধন করা অনেক বেশি সহজ হয়ে ওঠে। তাই খাদ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে মানুষের থালা পর্যন্ত পৌঁছানোর প্রতিটি স্তরে কঠোর নজরদারি, বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা আজ সময়ের দাবি।
আমাদের দেশ ও জাতিকে যদি সত্যিকারের উন্নত স্তরে নিয়ে যেতে হয়, তবে শুধু বড় বড় রেস্তোরাঁর চার দেয়ালে নয়, বরং রাস্তার ধারের সাধারণ হোটেল থেকে শুরু করে প্রতিটি খাদ্য উৎপাদনকারী কারখানায় আন্তর্জাতিক মানের ফুড সেফটি গাইডলাইন বাস্তবায়ন করতে হবে এবং একই সাথে সাধারণ মানুষের মাঝেও সচেতনতার এক বিশাল বিপ্লব ঘটাতে হবে।
আ হ জুবেদ (সম্পাদক অগ্রদৃষ্টি)











