সৈয়দ মুস্তাফিজুর রহমান: শারিরিক শক্তি ও মানসিক চিন্তা চেতনা বুদ্ধিমত্তা বিকাশের অন্যতম মাধ্যম হলো খেলাধুলা। পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন রকমের খেলাধুলা শিশু কিশোরদের মনস্তাত্তিক পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বর্তমানে শিশু কিশোর যেন বিদ্যার একেক জাহাজে পরিণত হচ্ছে। যে জাহাজ পরিপূর্ণ হয় বই-কলম আর দিস্তা দিস্তা কাগজে। হালযামানার ডিজিটাল যুগে শিশু কিশোরদের অধিকাংশ ভাগ স্কুল কলেজ,কোচিং এ ব্যস্ত সময় কাটায়, বন্ধুত্বের সাথে আড্ডায় থাকে কিংবা প্রযুক্তিপণ্যে ব্যবহারে সময় অবিবাহিত করে। সকালে স্কুল কিংবা কলেজের ক্লাস আর সূর্যের শেষ বিকেলের আলো যখন নিভু নিভু হয়ে পশ্চিম আকাশে হারাতে যায় তখনও যেন একটু অবসর নেই কোমলমতি শিশুকিশোরদের। পড়ন্ত বিকেল হলেই শুরু হয় ব্যাগ নিয়ে কোচিং এ ছুটাছুটি। সুস্থ দেহ প্রশান্ত মন কর্মব্যন্ত সুখী জীবন তখনই গঠন হয় যখন পড়ালেখার পাশাপাশি সুযোগ হয় খেলাধুলা করার । খেলাধুলার করার ফলে শিশু কিশোরদের দৈহিক ও মনগত চিন্তায় আসে পরিবর্তনের নদীতে আসে নব জোয়ার। যে জোয়ারে ভেসে যায় দু:খ গ্লানি ক্লান্তির ছাপ। প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার পাশাপাশি কোমলমতি শিশু কিশোরদের জন্য প্রয়োজন খেলাধুলায় অংশগ্রহন করা। খেলাধুলা করার ফলে শিশু কিশোরদের মনে সমষ্টিগত দলবদ্ধ ভাবে কাজ করার মনমানসিকতা তৈরি হয়। পড়াশোনার পাশাপাশি শিশু কিশোররা যদি পর্যাপ্ত খেলাধুলা করে তাহলে প্রত্যেকের মানসিক চিন্তার বিকাশ সাধন হবে। খেলাধুলা ও সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যমেই শিশুর ভেতরের সুপ্ত প্রতিভা জাগিয়ে তুলতে হবে। শিশুদের কচি মনে হাজারো স্বপ্ন,হাজারো গল্পের বুনন। হাজারো স্বপ্ন হারিয়ে যাচ্ছে পড়ালেখার চাপ আর মাঠশূণ্য নগর জীবনে। অধিকাংশ এলাকায় মাঠ বলতে গেলে নেই। রাজধানী শহর ঢাকায় দিনদিন খেলার মাঠ,খোলা জায়গা হারিয়ে যাচ্ছে কিংবা বেদখল করছে কিছু প্রভাবশালী মহল। ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের হিসাবে ৫৪ টি পার্ক ও ২৫ টি খেলার মাঠ। উত্তর সিটি কর্পোরেশনে রয়েছে ২৯ টি পার্ক ও ১৫টিখেলার মাঠ আর দক্ষিণের সিটি কর্পোরেশনে রয়েছে ২৫ টি পার্ক ও ১০ টি খেলার মাঠ। কাগজে কলমে এসব পার্ক মাঠের অস্তিত্ব রয়েছে তবে খেলাধুলা কিংবা আনন্দ উল্লাসের সুযোগ বলতে গেলে নেই। বাংলাদেশ পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন ২০০৩-০৪ সালের জরিপে জানা যায় ৯০ টি খেলার মাঠ খোলা জায়গার অস্তিত্ব থাকলেও তা এখন ৩০-৪০ টিতে নেমে এসেছে। মহানগরীর খেলার মাট,খোলা জায়গা,জলাধার আইন-২০০০ থাকলেও নেই কোন কার্যকরী ব্যবস্থা। রাজধানী শহর ঢাকার বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য কয়েকশ খেলার মাঠও কিছু মুক্ত জায়গা ছিল কিন্তু বর্তমানে অধিকাংশ খেলার মাঠ,মুক্ত জায়গা সব রয়েছে বেদখলে। খেলার মাঠ ও মুক্ত জায়গা শুশু শিশু কিশোরদের জন্য নয় বরং সুস্বাস্থ্যকর পরিবেশের জন্যও খুব প্রয়োজন। ভূমিকম্পের ঝুকি যে শহরের বেশি সেইসব শহরে অধিক মাঠ ও খোলামেলা জায়গার দরকার খুব বেশি। ঢাকার পাশাপাশি বিভাগীয় শহর সিলেট শহরেও সংকট খেলার মাঠ কিংবা মুক্ত জায়গার। দিনে দিনে সিলেটেও হারিয়ে যাচ্ছে মাঠ,খেলার জায়গা,খোলা স্থান। মাঠ কিংবা খোলা জায়গার অভাবে শিশু কিশোররা পারছেনা খেলাধুলা করতে। খেলাধুলা চিত্তবিনোদন,আনন্দের খোরাক। চিত্তবিনোদন শূণ্যতায় অল্প বয়সেই বিভিন্ন অপরাধ চক্রে জড়িয়ে যাচ্ছে কোমলমতি শিশুরা। সিলেট শহরের খেলার মাঠগুলোও হয়ে যাচ্ছে বেদখল। বেদখলকৃত মাঠ উদ্ধারেও নেই কোন তৎপরতা বরং অলসতাই যেন কর্ম। নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই নির্মিত হচ্ছে যত্রতত্র বাসা বাড়ি কিংবা বিভিন্ন স্থাপনা। যার ফলে হারিয়ে যাচ্ছে মাঠ, খেলাধুলার করার অবাধ সুযোগ সুবিধাও হ্রাস পাচ্ছে সময়ের ব্যবধানে। খেলার মাঠ কিংবা খোলামেলা জায়গার অভাবে বর্তমানে বাসার ছোট্র আঙিনায় অথবা বাসাবাড়ির ছাদেও খেলা করতে দেখা যায় অনেকেই। খেলাধুলা শারিরিক বিকাশে সাহায্য করে কিন্তু বর্তমান সময়ে শিশু কিশোররা না পাচ্ছে খেলার সময়,না পাচ্ছে এক টুকরো সবুজ ঘাসের মাঠ।ইদানীং কালের শিশু কিশোরেরা যান্ত্রিক জীবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে। সকাল হলেই শুরু হয় স্কুল যাওয়ার প্রস্তুতি আর বিকেলে সোনাঝরা রোদে চলে যেতে কোচিং কিংবা প্রাইভেটে স্যারের বাসায়। মাঝে মাঝে পড়ার ফাঁকে সময় পাওয়া যায় তবে মাঠের অভাবে খেলাধুলা করা হয়না অধিকাংশদের। সিলেট শহরের আলিয়া মাদ্রাসা মাঠ,মনিপুরী মাঠ,কালা পাথর মাঠ অল্প পরিসরে খেলাধুলা করা হয়। আলিয়া মাদ্রাসার মাঠে খেলাধুলা করা হলেও গাড়ি পার্কি এর জন্য কিছুটা অসুবিধা সৃষ্টি হয়। আম্বরখানার মনিপুরী মাঠ ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যাচ্ছে।মাঠের একদিকের মাটি ধসে পড়ছে যার ফলে মাঠের আয়তন হ্রাস পাচ্ছে। নগরীর ঐতিহ্যবাহী রেজি:মাঠ দখল করে নিয়েছে হকার ব্যবসায়ীরা।এখন আর কোন ধরণের খেলাধুলা করার সুযোগ নেই এই মাঠে। মেডিকেল মাঠে আগের মত খেলাধুলা করার সুযোগ হয়না কারণ সেখানে স্থাপন করা হয়েছে নার্সিংহোম ও ইন্টার্নি শিক্ষার্থীদের আবাসন।এসব মাঠের পাশাপাশি রায়নগর ডেপুটি বাড়ির মাঠ,বাগবাড়ি বর্ণমালা স্কুল মাঠ,বাগবাড়ি এতিম স্কুল মাঠ,পনিটুলা মাঠ সহ অন্যান্য মাঠগুলো হারিয়ে যাচ্ছে কালের পরিক্রমায় দখলদারদের হাতে কিংবা কতৃপক্ষের অবহেলায়,অযতেœ। কলেজ ভিত্তিক মাঠগুলো যেন হারাতে বসেছে তার চিরচেনা রূপ।এমসি কলেজমাঠে খেলাধুলা হলেও নেই সুষ্ঠ ব্যবস্থা।অবহেলা অযতেœই খেলাধুলা করেছে পাড়ার শিশুকিশোর আর কিছু শিক্ষার্থীরা। বৃষ্টি হলেই মাঠে জমে যায় পানি। সিলেট সরকারি কলেজে মাঠ থাকলেও নেই খেলাধুলার আনাগোনা। শিশুকিশোরদেরকে খেলাধুলায় আগ্রহী করে তুলতে প্রয়োজন বিভিন্ন স্কুল কলেজ আন্ত প্রতিযোগিতা। এইসব প্রতিযোগিতায় থেকেই বেরিয়ে আসবে আগামী দিনের মাশরাফি,জাদুকর সামাদ,মোনেম মুন্না,মুশফিকেরা। শিশু কিশোর আগামীর স্বপ্ন কারিগর। পড়ালেখার পাশাপাশি প্রয়োজন তাদের দৈহিক বিকাশের। খেলা শিশু কিশোরদের কচি মনের পরিবর্তনে কার্যকরী ভূমিকা রাখে। খেলাধুলা না করায় বর্তমানে সময়ের শিশুকিশোররা তাদের সময়গুলো পার করে থাকে আড্ডায়,টিভি,কম্পিউটার কিংবা ভিডিও গেমসে। প্রযুক্তি নির্ভর হয়ে যাওয়ায় নিজের মাঝে নিজেকেই গুটিয়ে নেয় একটি শিশু কিংবা কিশোর।নিজেই তৈরি করে নেয় আলাদা এক জগৎ। রোবট যন্ত্রের মতো বেড়ে ওঠছে শিশুকিশোররা। দখলদারদের বেদখলে হারিয়ে যাচ্ছে মাঠ যার ফলে সাদাকালো হয়ে যাচ্ছে শৈশব কৈশোরের রঙিন দিনগুলো। শিশু কিশোরেরা বন্দি হয়ে পড়ছে বাসার চার দেয়ালে আর আধুনিকতার প্রযুক্তি পণ্য যেমন মোবাইল কিংবা কম্পিউটারের,গেমস ডিভাইসের পর্দায়। বাসার বাড়ির বাহিরে খেলাধুলা করার সুযোগ না থাকায় তারা ঘরেতেই অলস সময় পার করছে। আধুনিক সময়ের শিশু কিশোররা টিভি,কম্পিউটার,গেমস ইত্যাদি নিয়ে মেতে থাকে। প্রযুক্তিপণ্য অধিক ব্যবহারে শিশু কিশোররা হয়ে ওঠে একগুয়ে আর ঘরমুখী। যে সময় খেলাধুলা করে সময় কাটানোর কথা তখন সে মজে থাকে প্রযুক্তিপণ্যে। শিশু কিশোররাই পরিবতনের কারিগর। তাদের বুকে রয়েছে আলোক ¯্রােত। সেই ¯্রােতধারায় ভেসে যাবে জীবনের গ্লানিতা। সাফল্যের স্বর্ণালী শিখরে পৌঁছে যাবে যদি সঠিক নির্দেশনা পায়। সাফল্য অবশ্যই ধরা দেয় তাদের হাতে যারা সাফল্য বিজয় মাল্য নিয়ে আসতে হিমালয়ের চূড়া হতেও। শিশুকিশোরেরা এগিয়ে যাবে ক্ষিপ্র গতির ভোরের আলোয় ছুটে চলা অশ্বারোহীর মত। পড়ালেখার পাশাপাশি খেলাধুলা শিশু কিশোরের কোমল মনে তৈরি করে ভাল কিছু করার মনমানসিকতা। সমাজের,পরিবারে সবাইকে এগিয়ে আসতে খেলাধুলা করার সুযোগ তৈরি করতে। তারা যদি সুন্দর মনের অধিকারী হয় তাহলে তাদের কর্ম দিয়ে,চিন্তা চেতনার পরিবর্তনে পাল্টে দিবে আমাদের এই দেশ। শিশুকিশোরদের কচিহাত একসময় দায়িত্ব নিবে আর তাদের বিচার বুদ্ধি কর্মে এগিয়ে যাবে আমাদের দেশ প্রিয় বাংলাদেশ। আমাদের প্রিয় দেশকে এগিয়ে নিতে হলে প্রয়োজন মাঠ ব্যবস্থার উন্নতি ও তরুণ প্রজন্মকে খেলাধুলা করার সুযোগ তৈরি করে দেয়া তবে এগিয়ে যাবে কোটি কোটি লোকের প্রিয় দেশ বাংলাদেশ,সবার প্রিয় বাংলাদেশ।