এখানে আসার আগে অবধি মুসলমান মানে বাঙালী আর কিছুটা লক্ষ্ণৌবাসী মুসলিম বুঝতাম ; তাঁদের জীবনযাত্রা খাওয়াদাওয়া কেমন হয় জানতাম। বাঙালী হিন্দু মুসলমান সবাই তো একই রকম শাক শুক্তো মাছ ভাত খেয়ে অভ্যস্ত। লক্ষ্ণৌয়ে বিরিয়ানী কাবাব হয়ত বেশি চলে। আসলে খাওয়াদাওয়া নির্ভর করে আর্থিক ক্ষমতা এবং জলবায়ুর ওপর।
কুয়েতিদের খাদ্যাভ্যাস এক্কেবারে সাহেবী। তেল মশলা মোটেও খায়না। বহুবার হোটেল রেস্ট্যুরেন্টে ব্যুফে খেতে গিয়ে আমরা যখন থালা উপচিয়ে বিরিয়ানী কাবাব মাছ মাংসের গুচ্ছের আইটেম নিচ্ছি, এঁরা নিচ্ছেন স্যুপ, ছোট্ট একটা খুবুস ( ময়দা আর কলা দিয়ে নরম সুস্বাদু রুটি ) আর একগাদা স্যালাড। বড়জোর ছোট্ট এক টুকরো শিশতাউক (সিদ্ধ বা ঝলসানো মাংস)।
খাসীর মাংস দুএক জায়গায় ফ্রোজেন এবং ফ্রেশ পাওয়া যায়, ঘরে রেঁধে নিতে হয়। রান্না করা ভেড়ার মাংস আর গোমাংস পরিবেশিত হয়। কুয়েতিদের নিরামিষ বা অল্প চিকেন খেতে দেখি। উটের মাংসের ঝোল ঝাল পরিবেশন হতে দেখিনি। তবে ব্যুফেতে মাঝখানে একটা কাঠের মস্ত বারকোশে পাহাড়ের মত করে কুয়েতি বিরিয়ানী রেখে তার চুড়োয় তাঁর একখান বিশাল পিস্ “মরু বিজয়ের কেতন” হয়ে অবস্থান করে। লোকে কেটে কেটে প্লেটে তুলে নেয়।
আমরা যখন নিই ফলের রস, এঁরা নেন নানারকম গোটা ফল। ভারতীয় হোটেলে এরা খুব যায়। মতি মহল, তাল ভারতীয় মোগলাই রেস্টুরেন্ট। আশা ভোঁসলের রেস্টুরেন্ট আশা’স।এগুলোয় গোমাংস রাঁধা হয়না। কুয়েতিরা এইসব রেস্টুরেন্টে বেজায় ভিড় করে স্যালাড আর লস্যি খান।
তবে এরা খুব খাবার নষ্ট করে। গন্ধমাদনের মত স্যালাড আর ফল নেবে, খাবে একটু একটু খুঁটে। একবার ব্রেকফাস্টে দেখলাম এক কুয়েতি মহিলা একটা টুকরিভর্তি নানা রকম ব্রেড, একগাদা সসেজ আর স্যালাড, আপেল কলা হ্যানত্যান মিলিয়ে পাঁচ ছ রকম গোটা ফল নিয়ে টেবিল জুড়ে বসে এক ঘন্টা ধরে ফোন ঘাঁটলেন আর এক কাপ আরবী কফি খেলেন। তারপর একটা স্ট্রবেরী খেতে খেতে বেরিয়ে গেলেন। আমরা গরীব দেশের লোক তো, খাদ্যের এই অপমান বড়ো পীড়া দেয়।
মিষ্টিফিষ্টি মোটেও বানাতে জানেনা এরা। অবশ্য বাঙালিদের মত মিষ্টি তো ভারতের অন্যান্য রাজ্যও বানাতে পারেনা। উম আলি বলে শাহী টুকরার মত একটা মিষ্টি ভারতীয় জিভে একটু ভালো লাগে, তা আমার তো ওটা দুধ পাঁউরুটি ঘাঁটা মনে হয়। বাকলাভা, বাসবুসা, হাজেরবাবার নানা রকম ক্যান্ডির মত কি সব আর লকুমা নামকরা আরবী মিষ্টি। আমার অবশ্য খুব চড়া দাগের লাগে। দোকানে যে হারে এরা কেসি দাসের রসগোল্লার টিন বা হলদিরামের শোনপাপড়ি গুলাবজামুন কেনে, বোঝাই যায় এরাও ভারতীয় মিষ্টিই পছন্দ করে।
গরমে এখানে খুব ধুমধাম করে ম্যাঙ্গো ফেস্টিভ্যাল হয়। উঁচু উঁচু ঝুড়ি ভর্তি করে মালদা মুর্শিদাবাদের এক একটা আমবাগান কুয়েতিদের ঘরে চলে যায়। দোকানের বাঙালি কর্মচারী সেই সব ঝুড়ি কুয়েতিদের অডি মার্সিডিজে তুলে দেন। আলফানসোর বাজারও এখানে খুবই ভালো।
দক্ষিণী খাবারের প্রচুর দোকান এখানে। ইডলি দোসা উত্তাপম অঢেল পাওয়া যায়। কেরালা আর তামিলনাড়ুর মানুষ যে প্রচুর। কুয়েতে কুয়েতি আর ভারতীয় জনসংখ্যার অনুপাত প্রায় সমান। বাংলাদেশের বাঙালিও অনেক।মজা করে বলা হয় কুয়েতে কাজ করতে হলে আরবী জানতেই হবে, খুব যদি কঠিন লাগে তো মালায়লাম জানলেও চলবে। আর সরকারী অফিসে বাংলা জানলেই কেল্লা ফতে। সুইপার পিওন সবাই বাঙালি। ভাষার টানে তাঁরা সানন্দে আমাদের সহযোগিতা করেন এবং তাঁদের সেই সাহায্যের বিনিময়ে সামান্য অর্থদান করতে গেলে আত্মসম্মানসম্পন্ন গরীব মানুষগুলো বড়োই বিব্রত ও কুন্ঠিত হয়ে পড়েন।
সরকারী অফিসের বেশিরভাগ কুয়েতিই ইংরিজি জানেনা বা ইচ্ছে করে বলেনা। তার ওপর সমস্ত কাউন্টারে থাকে জাঁদরেল মহিলা কর্মচারী। কর্তা একবার আমাদের ভিসা বানাতে গিয়ে নাকানিচোবানি। কুয়েতি কর্মচারিনী ভাবলেশহীন মুখে কী যে বলছে কর্তা কিচ্ছু বুঝছেননা। বারবার যত অনুরোধ করছেন Please speak in English, সে ততই আরবীতে কি সব বলে চলে। শেষে কর্তা বিশুদ্ধ বঙ্কিমী বাংলায় বললেন “মহাশয়া ! আপনি কি কহিতেছেন, আমি কিছুমাত্র বুঝিতে পারিতেছিনা।” অমনি মহিলা গড়গড় করে ইংরিজি বলতে লাগল। সেই দুর্যোগে নাস্তানাবুদ হয়ে তার পরপরই কর্তা আমাদের রেসিডেন্ট ভিসা করালেন।
আজ দুটো আরবী শব্দ শিখুন, পড়া পারলে কাল একটা মজার গল্প বলব।
খাল্লাস — done / হয়ে গেছে
রো — get lost / বেরোও / ভাগো
লেখক:
গার্গী চক্রবর্তী (ভারত)
চলবে……