Menu |||

১৬ই ডিসেম্বর আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক ওসমানীকে হত্যা চেষ্টার রহস্য উন্মোচিত হয়নি 

অগ্রদৃষ্টি ডেস্কঃ ১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১সালে পাকবাহিনীর আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক বঙ্গবীর জেনারেল মহাম্মদ আতাউল গণী ওসমানী কেন অনুপস্থিত ??
জাতীয় জনতা পার্টির প্রধান, বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক জাতীয় সংসদ সদস্য, এডভোকেট মোঃ নূরুল ইসলাম খান।
১৬ই ডিসেম্বর পাকবাহিনী আত্মসমর্পণ করে ভারতীয় বাহিনীর পূর্বাঞ্চল কমান্ডের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার নিকট। জেনারেল অরোরা একাত্তরের ৩রা ডিসেম্বর থেকে মিত্রবাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর যৌথ কমান্ডের একক কমান্ডার ছিলেন। আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়কের অনুপস্থিতি দেশবাসীকে মর্মাহত করেছে।
উক্ত অনুষ্ঠানে দর্শকের ভূমিকায় উপস্থিত ছিলেন ডেপুটি চীপ-অব-স্টাফ গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ.কে খন্দকার। অনুষ্ঠানে ওসমানীর অনুপস্থিতি নিয়ে অনেকেই অজ্ঞতাপ্রসূত মনগড়া কথা বলেছেন। কেউ কেউ ওসমানীকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য উদ্দেশ্যমূলক ভাবে বিকৃত তথ্য দিয়ে সকলকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছেন।
নয় মাস কঠিন যুদ্ধ পরিচালনা করে রণাঙ্গন থেকে রণাঙ্গনে ছুটে গিয়ে যিনি দেশ শত্রুমুক্ত করলেন, হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের সময় তিনিই উপস্থিত থাকতে পারলেন না। এ এক জটিল ঘটনা, একটি রহস্যাবৃত বিষয়। কুচক্রী মহল বারংবার এ নিয়ে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে অনেক কাহিনীর সৃষ্টি করেছে ।
অনেক বিজ্ঞ, অভিজ্ঞ, তাত্ত্বিক, কবি, সাহিত্যিক, অধ্যক্ষ, রাজনৈতিক ব্যক্তি এই গঠনাকে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে জনসমক্ষে উপস্থাপন করেছেন। একজন হলেন কলম সুন্দর চাটুকার লেখক এম.আর.আক্তার মুকুল ‘আমি বিজয় দেখেছি’ বইটিতে লিখেছেন-
“১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর দুপুর প্রায় বারো’টা নাগাদ কোলকাতাস্থ থিয়েটার রোডে মুজিবনগর সরকারের অস্থায়ী সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তাজ উদ্দিন আহমদের কাছে খবর এসে পৌঁছালো, ঢাকায় হানাদার বাহিনী আত্মসমর্পণ করতে সম্মত হয়েছে। আজ বিকেলেই ঢাকায় আনুষ্ঠানিক ভাবে আত্মসমর্পণ হবে। মুজিবনগর সরকারের পক্ষ থেকে এই অনুষ্ঠানে প্রতিনিধিত্ব করার জন্য উচ্চপদস্থ কাউকে উপস্থিত থাকতে হবে। ………………..প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীনকে তখন কিছুটা চিন্তিত দেখাচ্ছিল। ……………………প্রধানমন্ত্রী তাঁকে (জেনারেল ওসমানী) দেখে আনন্দে এক রকম চিৎকার করে উঠলেন, সি-ইন-সি সাহেব ঢাকায় সর্বশেষ খবর শুনেছেন বোধহয়?
এখনতো আত্মসমর্পণের তোড়জোড় চলছে। ……………………প্রধানমন্ত্রী বাকী কথাগুলো শেষ করতে পারলেন না। ওসমানী সাহেব তাঁকে করিডোরের আর এক কোণায় একান্তে নিয়ে গেলেন। দুজনের মধ্যে মিনিট কয়েক কি কথাবার্তা হলো, আমরা তা শুনতে পেলাম না। …………… ওসমানী সাহেবের শেষ কথাটুকু আমরা শুনতে পেলাম- ‘নো নো প্রাইম মিনিস্টার, মাই লাইফ ইজ ভেরী প্রেশাস, আই কান্ট গো’।”
এই কলম সুন্দর মুকুলের লেখার প্রেক্ষিতে আরেকটি লেখা উত্থাপন করা অপরিহার্য বলে মনে করি। আওয়ামীলীগের এম.এন.এ. মোহাইমেন ‘ঢাকা-আগরতলা-মুজিবনগর’ গ্রন্হের ১৬০পৃঃ লিখেছেন-
“১৬ই ডিসেম্বর পাকবাহিনী আত্মসমর্পণ করবে, শুনে ছুটে গেলাম আঁট নং থিয়েটার রোডে তাজউদ্দিন সাহেবের সাথে দেখা করার জন্য। তিনি হয়তো ততক্ষণে ঢাকায় চলে গেছেন অথবা যাত্রার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কিন্তু গিয়ে দেখলাম তাজউদ্দিন সাহেব স্বাভাবিক পোষাকে বসে আছেন। তিনি কখন যাবেন জিজ্ঞাসা করায় বললেন তিনি যাবেন না। তখন আমি আশ্চর্য্য হলাম। এতদিন পর দেশ স্বাধীন হচ্ছে, শত্রু বাহিনী আত্মসমর্পণ করছে এ সময় প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন না ব্যাপারটা আমার কাছে মোটেই বোধগম্য হলো না। কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন- ‘শেখ মণি ও মুজিব বাহিনীর সঙ্গে আমার সম্পর্ক তো আপনার জানা আছে। সৈন্যবাহিনীতে আমার শুভাকাঙ্খীদের কাছ থেকে আমি জানতে পেরেছি এই মুহূর্তে ঢাকায় সম্পূর্ণ অরাজক অবস্থা চলছে। ঠিক এসময় ঢাকায় কোন জনসমাবেশের মধ্যে আমার উপস্থিত থাকা মোটেও নিরাপদ নয়। জনতার ভিড়ের মধ্যে মুজিব বাহিনীর লোকেরা যে কোন মুহূর্তে আমাকে গুলি করে হত্যা করে ফেলতে পারে কিন্তু দোষ চাপিয়ে দিতে পারে আল-বদর, আল-শামসের ঘাড়ে এবং লোকেরাও সেটা বিশ্বাস করবে। তাই আমার শুভাকাঙ্খীরা বলেছে, ঢাকার অবস্থা মোটামোটি আয়ত্বে আসলে তারা আমাকে জানাবে এবং আমি আশাকরি দু’একদিনের মধ্যে আমি যেতে পারব।’ ওসমানী সাহেব যাচ্ছেন কিনা জিজ্ঞাস করায় তিনি বললেন-‘তিনিও যাচ্ছেন না’।”
ওসমানীর পি.আর.ও. নজরুল ইসলামের বক্তব্যঃ-
“ঢাকার আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে মুজিবনগর সরকারের পক্ষ থেকে কে উপস্থিত থাকবেন- এ নিয়ে যখন নানা গুজব ও কানাঘুষা চলছিলো, সে সময় জেনারেল ওসমানী কলকাতায় অনুপস্থিত। তিনি কোথায় গেছেন বা কোথায় ছিলেন তা কেউ ভাল করে জানেনও না। এমনকি আমিও জানি না। তার দপ্তরের কোন সামরিক কর্মকর্তা এ সম্পর্কে মুখ খুলছেন না।
আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানের দু’দিন পর জেনারেল ওসমানী মুজিবনগর সদর দপ্তরে ফিরে আসেন। তাঁকে আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে অনুপস্থিত থাকার কারণ জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন- ‘দেখুন আমরা স্বাধীনতা অর্জন করতে যাচ্ছি। কিন্তু দুঃখ হলো স্বাধীন জাতি হিসাবে আমাদের মধ্যে আত্মমর্যাদাবোধ সম্পর্কে কোন চেতনা এখনো জন্ম হয়নি। ঢাকায় আত্মসমর্পণের অনুষ্ঠানে আমার যাওয়ার কোন প্রশ্নই উঠে না। কারণ, এই সশস্ত্র যুদ্ধ ভারত-বাংলাদেশের যৌথ কমান্ডের অধীনে হলেও যুদ্ধের অপারেটিং পার্টির পুরো কমান্ডে ছিলেন ভারতীয় সেনা প্রধান লেঃ জেনারেল শ্যাম মানেকশ্। আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে জেনারেল মানেকশ্’কে রিপ্রেজেন্ট করবেন লেঃ জেনারেল অরোরা। আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে মানেকশ্‌ গেলে আমার যাবার প্রশ্ন উঠত। সার্বভৌম ক্ষমতার ভিত্তিতে আমার অবস্থান জেনারেল মানেকশ্‌র সমান। সেখানে মানেকশ্‌র অধীনস্থ আঞ্চলিক বাহিনীর প্রধান জেনারেল অরোরার সফরসঙ্গী আমি হতে পারি না। এটা কোন দেমাগের কথা নয়। এটা প্রটোকলের ব্যাপার। আমি দুঃক্ষিত, আমাকে অবমূল্যায়ন করা হয়েছে। আমাদের মধ্যে আত্মমর্যাদার বড় অভাব।
ঢাকার ভারতীয় বাহিনী আমার কমান্ডে নয়, জেনারেল মানেকশ্‌র পক্ষে জেনারেল অরোরার কমান্ডের অধীনে ঢাকায় ভারতীয় সেনাবাহিনী। পাকিস্তানী সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করবে যৌথ কমান্ডের অধীনে ভারতীয় বাহিনীর কাছে। আমি সেখানে (ঢাকায়) যাব কি জেনারেল অরোরার পাশে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখার জন্য? হাউ ক্যান।
আত্মসমর্পণ দলিলে স্বাক্ষর করবেন জেনারেল মানেকশ্‌র পক্ষে জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা আর পাকিস্তানী বাহিনীর পক্ষে জেনারেল নিয়াজী। এখানে আমার ভূমিকা কি? খামোখা আমাকে নিয়ে টানা হেঁচড়া হচ্ছে।”
এ হচ্ছে আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে ওসমানীর অনুপস্থিতি সম্পর্কে বিভিন্ন লেখকের মূল্যায়ন।
বঙ্গবীর জেনারেল মহম্মদ আতাউল গণী ওসমানী সাহেবের সাথে পরিচয়কালীন স্মরণীয় দিনগুলিঃ-
জেনারেল ওসমানীর সঙ্গে আমার পরিচয় ১৯৭০ সালে। ঐ সময় তিনি রাজনীতিতে যোগদান করেন। ডিসেম্বর মাসে সাধারণ নির্বাচনে বিশ্বনাথ, বালাগঞ্জ, গোলাপগঞ্জ ও ফেঞ্চুগঞ্জ নির্বাচনী এলাকা থেকে তিনি জাতীয় পরিষদ সদস্য নির্বাচিত হন। নির্বাচনকালীন আমি বিশ্বনাথ থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলাম। যার জন্য তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুযোগ হয়েছিল এবং সেই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ১৯৮৪ সনে চিকিৎসার জন্য তাঁর লন্ডন যাওয়া পর্যন্ত এবং লন্ডনে তাঁর মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত ছিল। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন প্রবাসী বাঙ্গালীদেরকে সহযোগীতা করার জন্য প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার ও ব্রিটিশ সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় করিমগঞ্জে একটি ইমিগ্রেশন এডভাইজারী কমিটি গঠন করা হয়। যার প্রধান ছিলেন জনাব আব্দুর রহিম এম.আন.এ. এবং আমি ছিলাম তাঁর সম্পাদক। প্রবাসীদের সমস্যা ছিল সীমিত, শেষ দিকে কিছু সমস্যা সমাধানের জন্য আমি আগস্ট মাসের মাঝামাঝি কলকাতা যাই। এই সময় ওসমানী সাহেব, আমি কলকাতায় আছি সংবাদ পেয়ে বার বার তাঁর সঙ্গে দেখা করার জন্য আমাকে খবর দেন। এক সময় তাঁর সঙ্গে দেখা করি। এরপর থেকে প্রায়ই তাঁর সঙ্গে দেখা করতে হতো। কোন দিন না গেলে তিনি গাড়ি পাঠিয়ে আমাকে নেওয়াতেন। তিনি আমাকে বিভিন্ন এসাইনমেন্ট দিতেন, অলিখিত ভাবে তাঁর ব্যাক্তিগত সহকারীরও কাজ করতাম। এই সময় তাঁর বিভিন্ন ঘটনা এবং তাঁর সম্পর্কে নানা রকম সংবাদ পেতাম।
জেনারেল ওসমানী ছিলেন অত্যন্ত আত্মমর্যাদা সচেতন ব্যক্তিত্ব। নিজ দেশের স্বাধীন সত্ত্বা সম্পর্কে তাঁর অহঙ্কার ছিল। তিনি যে দেশের কমান্ডর-ইন-চীফ সেই প্রটোকলের প্রতি তাঁর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ছিল। আমি তাঁর সঙ্গে বসে গল্প করার সময় মাঝেমাঝে আর্মি অফিসাররা আসতেন, তখন আমি অফিস রুমের একপাশে একটা সোফাসেট ছিল, সেখানে বসে পত্রিকা পড়তাম। একদিন দেখলাম ইন্ডিয়ান দু’জন আর্মি অফিসার আসলেন, ওসমানী সাহেবকে স্যালুট করলেন। চেয়ারে বসে অনেকক্ষণ কথা বললেন, ঐ সময় ওসমানী সাহেব তাঁর নিজের চেয়ার খালি রেখে অন্য একটা চেয়ারে বসে কথা বলছিলেন। এই দেখাটা আমার চোখে প্রথমে ভুল মনে করেছিলাম কিন্তু আরও দু’এক দিন প্রত্যক্ষ করে দেখলাম যে ঘটনা ঠিকই। ঐ অফিসাররা কোন র্যাতঙ্কের ছিলেন আমার খেয়াল নাই। তারপর আমি ওসমানী সাহেবকে কথাটা জিজ্ঞাসা করলে তিনি মৃদু হেসে প্রথমে বললেন ‘আপনি বসে বসে এইগুলি দেখেন বুঝি’ তারপর বললেন, ‘আমরা সবাই ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান আর্মিতে কর্মরত ছিলাম। এই অফিসাররা আমর সিনিয়র ছিল কিন্তু এখন আমি একটা দেশের কমান্ডার-ইন-চীফ হওয়ায় তারা আমাকে স্যালুট করেছে। আমি আমার চেয়ারটা খালি রেখে তাহাদেরকে সম্মানটুকু দেখালাম’।
আরেকদিন সন্ধ্যার পর আমি ওসমানী সাহেবের অফিসে গেছি। তখন তিনি কয়েকজন বিদেশীদের সঙ্গে কথা বলেছেন। আমি তাঁর এ.ডি.সি. ক্যাপ্টেন নূরের অফিসে গিয়ে বসেছি। ক্যাপ্টেন নূর বললেন ‘আজকের কেবিনেট মিটিংয়ে ওসমানী সাহেবের প্রশ্নের জবাব দিতে দিতে ডি.পি.ধর. ১৬বার পানি খেয়েছেন।’ ডি.পি.ধর. মিসেস গান্ধীর প্রতিনিধি হয়ে বাংলাদেশ কেবিনেট মিটিংয়ে বসতেন। আমি নূরকে জিজ্ঞাসা করলাম, ইস্যুটা কি ছিল? অনেক ইস্যুর মধ্যে একটা ইস্যু ছিল বাংলাদেশ সরকারের অনুমতি ছাড়া ছাত্রনেতাদের অস্ত্র দেওয়া। তখন আমি বললাম নজরুল ইসলাম ও তাজ উদ্দিন সাহেব তারা কি বললেন। নূর বললেন, নজরুল ইসলাম সাহেব বসে মৃদু হাসলেন এবং তাজ উদ্দিন সহ অন্যরা দু’একটা কথা বলেছিলেন। যার জন্য ওসমানী সাহেবের কথার কোন ফললাভ হয়নাই। পরে এই প্রসঙ্গে আমি ওসমানী সাহেবকে জিজ্ঞাসা করলে, তিনি বললেন, ‘ছাত্রনেতাদেরকে সরকারের অনুমতি ছাড়া অস্ত্র দেওয়ায় আমাদের অস্থায়ী প্রেসিডন্ট ও প্রধানমন্ত্রী ক্ষিপ্ত কিন্তু শক্তভাবে কিছু বলতে পারেননি।’ এই প্রসঙ্গটি আনলাম কারণ আমাদের প্রবাসী সরকার কোন শক্ত ভূমিকা নিতে পারেন নাই। যারজন্য মুক্তিযুদ্ধকালীন অনেক বিষয় নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন।
মুজিবনগর সরকারের অনেক কর্মকর্তা ওসমানী সাহেবের দপ্তর থেকে প্রত্যাখাত হয়ে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে আশ্রয় নিতেন। উধাহরণ স্বরূপ, মেজর জেনারেল নূরুল ইসলাম শিশু ও মেজর আবু ওসমান চৌধুরীর নাম বলা যায়। তাছাড়া কেউ কেউ ওসমানী সাহেবের নিকট থেকে অবৈধ সুযোগ সুবিধা না পেয়ে তাঁকে হেয় করার প্রয়াস চালাতেন এবং অদ্যাবধি তা চালিয়ে যাচ্ছেন, এদের মধ্যে এম.এর. আক্তার মুকুল একজন।
আমি জেনারেল ওসমানীর সঙ্গে ৭১সালের ১৩ই ডিসেম্বর সন্ধ্যা থেকে ১৫ই ডিসেম্বর দুপুর পর্যন্ত ছিলাম। নভেম্বর মাসের শেষ দিকে আমি কলকাতা থেকে করিমগঞ্জ আসতে চেয়েছিলাম, কিন্তু ওসমানী সাহেব আমাকে আসতে দেন’নি, বললেন, দেশ স্বাধীন হয়ে যাবে একসঙ্গে চলে যাব। ৩রা ডিসেম্বর ইন্ডিয়া যুদ্ধ আরম্ভ করার পর তাড়াতাড়ি চলে আসার জন্য করিমগঞ্জ করিমগঞ্জ থেকে আমার সহযোগীরা ৮/১০ টা টেলিগ্রাম করেন। আমি ওসমানী সাহেবকে টেলিগ্রামের কথা বললাম, তিনি আমাকে বললেন, ‘আপনি স্ট্যান্ড বাই থাকেন, আমি আপনাকে বিমানে করে সিলেট নামিয়ে দেব, করিমগঞ্জে টেলিগ্রাম করে সকলকে বলে দেন, তারা যেন এলাকায় চলে যায়।’ আমি ওসমানী সাহেবের কথার উত্তরে কিছুই বলতে না পেরে, তাই করলাম।
১৩ই ডিসেম্বর আমাকে ফোন করে বললেন, ‘আপনি তৈরি হন, ঘণ্টাখানেকের মধ্যে আমর গাড়ি আপনাকে নিয়ে আসবে।’ রাত্রি নয় ঘটিকায় তাঁর গাড়ি আমাকে তুলে নিয়ে গেল। অফিসে যাবার পর, তিনি বললেন, ‘কষ্ট করে এখানে ডালভাত খেয়ে ঘুমাতে হবে সকালে সিলেট রওয়ানা দিব।’
১৪ই ডিসেম্বর সকালে তাহার বিশেষ বিমানে দমদম এয়ারপোর্ট হতে রওয়ানা দিলাম। আমাদের সঙ্গে ছিলেন লেঃ কর্নেল এম.এ.রব, ইন্ডিয়ান ব্রিগেডিয়ার উজ্জ্বল গুপ্ত, ডাঃ জাফরউল্লা চৌধুরী, ওসমানী সাহেবের পি.এস. শেখ কামাল, মোস্তফা আল্লামা, মাওলানা শেখ মোঃ উবায়েদ উল্লা-বিন-সাঈদ জালালাবাদী ও আরও দু’এক জন। ওসমানী সাহেব আমাদেরকে সঙ্গে নিয়ে কয়েকটা রণাঙ্গন পরিদর্শন করেন। বাগাডুগরা এয়ারপোর্টে ঘাসের মধ্যে বসে দিনাজপুর সেক্টরের অফিসার ও জোয়ানদের সঙ্গে আমরা লাঞ্চ (মধ্যাহ্ন ভোজ) করি। দিনাজপুরের এম.এন.এ মুজিবুর রহমানসহ কয়েকজন ইন্ডিয়ান আর্মি অফিসার লাঞ্চে (মধ্যাহ্ন ভোজে) আমাদের সঙ্গে শরিক হন। সন্ধ্যায় গৌহাটি পৌঁছি এবং রাত্রি যাপন করি।
১৫ই ডিসেম্বর সকালে গৌহাটি থেকে বিমান ছাড়ার পর ওসমানী সাহেব আমাকে ডেকে তাঁর পাশে বসান এবং বলেন, সিলেট বিমানবন্দর পুরোপুরি ক্লিয়ার হয় নাই। যার জন্য তিনি কুমিল্লা চলে যাবেন এবং সেখান থেকে পরে সিলেট আসবেন। আমাকে তাঁর সঙ্গে যাবার জন্য বললেন। করিমগঞ্জে আমার সহযোগীদের সঙ্গে মিলিত হওয়ার জন্য উদগ্রীব থাকায় আমাকে কুম্বীগ্রাম বিমান বন্দরে নামিয়ে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করি। এই সময় ওসমানী সাহেব বলেন, পাকবাহিনী খুব তাড়াতাড়ি আত্মসমর্পণ করবে। দুপুরের দিকে বিমান কুম্বীগ্রাম বিমান বন্দরে অবতরণ করলে আমিসহ আরও দুইজন বিমান থেকে নামলাম। বিমান বন্দরে একজন ইন্ডিয়ান মেজর ওসমানী সাহেবকে স্বাগত জানালেন। আমাদের সবার ইচ্ছানুযায়ী মুক্তাঞ্চলে পৌঁছে দেওয়ার জন্য ওসমানী সাহেব ঐ মেজরকে নির্দেশ দিলেন। বিমান থেকে নামার সময় ওসমানী সাহেব আমার হাতে একটা চিরকুট দিলেন, চিরকুটটি নিয়ে মেজরের গাড়িতে উঠলাম। ওসমানী সাহেব কুমিল্লার দিকে রওয়ানা দেওয়ার পরে আমরা শিলচরের দিকে রওয়ানা দিলাম। রাস্তায় তাঁর স্বহস্তে লেখা চিরকুটটি দেখলাম। আমি যে বিমানে কুম্বীগ্রাম পৌছেছি এবং মুক্তাঞ্চলে যাওয়ার পথে যে কোন প্রকার সাহায্য করার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে তা চিরকুটে লেখা ছিল। চিরকুটের কপিটি নিম্নরূপঃ-
তারপরের বক্তব্য ওসমানী সাহেবের নিজস্বঃ-
“ ……………আমি তখন রণাঙ্গনে সফররত। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার বিশেষ করে অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট এবং প্রধানমন্ত্রী তথা প্রতিরক্ষা মন্ত্রী জানতেন আমাকে কোথায় পাওয়া যাবে। তাছাড়া মিত্র বাহিনীর উচ্চতম কর্মকর্তারাও জানতেন আমি কোথায়। তা-সত্ত্বেও আমাকে কেন খবর দেয়া হয় না। বরং গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার প্রধান আমার ডেপুটি চীফ-অব-স্টাফ তদানীন্তন গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ.কে.খন্দকারকে পাঠান। ঐ দিন ও এর আগের দিন আমি ময়নামতির রণাঙ্গনে এবং ১৬ই ডিসেম্বর দুপুরে লেঃ জেনারেল স্বাগত সিংহের সাথে মধ্যাহ্ন ভোজন করি। ১৬ই ডিসেম্বর দুপুরের পর তদানীন্তন লেঃ কর্নেল সফি উল্লাহর অধিনায়কত্বে ‘এস’ ফোর্স রণাঙ্গন পরিদর্শন করার জন্য আমার যাওয়ার কথা ছিল। জেনারেল স্বাগত সিংহ সেদিন না যেতে অনুরোধ করেন, বলেন, যে ‘এস’ ফোর্স পরিদর্শনে অসুবিধা হতে পারে, যেহেতু তারা অগ্রসর হচ্ছেন। আমি তখন আমার সফরসূচী পরিবর্তন করে সিলেট ‘জেড’ ফোর্স 2013পরিদর্শনে যাবার সিদ্ধান্ত নেই”।
উপরোক্ত বাস্তব তথ্য ও পরবর্তী ঘটনাবলী হতে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, উভয় ভারতীয় ও গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের শীর্ষপর্যায়ের মহান ব্যক্তিবর্গ (স্ব স্ব কারণে বা উদ্দেশ্যে) চাইতেন না যে, এই আত্মসমর্পণ বাংলাদেশ তথা মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়কের নিকট হোক, যদিও মুক্তিবাহিনী (নিয়মিত ও অনিয়মিত) সুদীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধ করেছিল এবং তাদের সর্বাধিনায়ক কেবিনেট মন্ত্রী সমপর্যায়ের মর্যাদার অধিকারী ছিলেন।
(সূত্রঃ মুজিবুর রহমান হিরু সম্পাদিত ‘বঙ্গবীর ওসমানী’ নামক পুস্তিকা, ওসমানীর সাক্ষাৎকার, রোববার ২৩শে মার্চ, ১৯৮০ স্বাধীনতা দিবস সংখ্যা )
ওসমানী অপরাহ্নে হেলিকপ্টার যোগে সিলেট রওয়ানা দেন এবং রাস্তায় তাঁর হেলিকপ্টারে গুলি করা হয়। তাঁর বিমানে গুলি হওয়ার ঘটনা ওসমানী সাহেব তাঁর জীবনে বিশেষ ঘটনার স্মৃতি হিসাবে নিম্নোক্ত ভাবে উল্লেখ করেছেনঃ-
“১৬ই ডিসেম্বর দুপুরের পরপরই ‘জেড’ ফোর্স পরিদর্শনে আমার সিলেট সফরে যাবার কথা। বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর দুটি ছোট ছোট হেলিকপ্টারে আগরতলা বিমান ঘাঁটি পৌঁছালে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর স্কোয়ার্ডন লিডার সুলতান মাহমুদ জানান যে, আমাদের ছোট দুটি হেলিকপ্টারের পরিবর্তে তিনি ভারতীয় বিমান বাহিনীর একটি বড় রুশী হেলিকপ্টার বন্দোবস্ত করেছেন। বিমান ঘাঁটিতে হঠাৎ করে কয়েকজন বিদেশী সাংবাদিক আমাকে ঘিরে ধরলে সময় নষ্ট হয়। তারপর সমবেত বৈমানিকদের নিকট থেকে বিদায় নেবার জন্য সুলতান কিছু সময় নষ্ট করে ফেললেন। কেন যেন মনে হলো, সুলতানকে বললাম “আমাদেরকে রেখে এই হেলিকপ্টার যদি সময় মতো না ফেরে তবে খবর নিও। প্রয়োজন হলে নিজে হেলিকপ্টার নিয়ে এসো। হেলিকপ্টারে উঠতে বিকেল ৪টার ঊর্ধে হয়ে যায়। হেলিকপ্টারের পেছনের “র্যা ম্প” খোলা ছিল। হেলিকপ্টারে ভারতীয় বিমান বাহিনীর দুজন তরুণ অফিসার একজন পাইলট এবং আরো একজন সহ-পাইলট, তৎসহ কেরালার অধিবাসী একজন ওয়ারেন্ট অফিসার ছিলেন। পাইলটদের বললাম যে, সিলেট বিমান ঘাঁটিতে যাব না, মাইন বা বাঁধা থাকতে পারে। আমরা যাব মেজর (পরে লেঃ কর্নেল) জিয়া উদ্দিন, বীর উত্তম এর অধীনে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ১ম ব্যাটালিয়ানের হেডকোয়ার্টারে। আমার জানা মতে, তাঁর হেডকোয়ার্টার সিলেট ‘কেটল ফার্মের’ সন্নিকটে। এর কাছেই কলেজের হোস্টেল, সামনে বিরাট খেলার মাঠ, হেলিকপ্টার নামার উপযোগী। পাইলটকে বললাম সিলেট শহরের নিকটে সুরমা নদীর কাছে পৌছলে আমাকে ডাকবে আমি তোমাকে গাইড করবো। ছেলেটি চলে গেল তার ‘ককপিটে’।
আমার সঙ্গে ছিলেন মুক্তি বাহিনীর ‘চীফ-অফ-দি-স্টাফ’ রূপে আমার সহকারী ও মুক্তিযুদ্ধের উপ-সর্বাধিনায়ক লেঃ কর্নেল (পরে মেজর জেনারেল) এম.এ.রব বীর উত্তম। ভারতীয় কমান্ডের ‘লিয়াজন অফিসার’ ব্রিগেডিয়ার উজ্জ্বল গুপ্ত, ডাক্তার জাফর উল্লাহ চৌধুরী, সাময়িক ভাবে আমার গণসংযোগ অফিসার জনাব মোস্তফা আল্লামা, আমার এ.ডি.সি. সেকেন্ড লেঃ শেখ কামাল। হেলিকপ্টার কিছুক্ষন থেকে তিন সাড়ে তিন হাজার ফুট উপর দিয়ে শান্ত ভাবে চলছে। আমি দাঁড়িয়ে আমার চীফ-অফ-স্টাফ কর্নেল রবের সঙ্গে কথা বলছি, তিনি আমার নিকট বসা। হঠাৎ একটা মৃদু বিস্ফোরণের শব্দে সকলেই চমকে উঠলাম। মশার মত আমার কানের ধার দিয়ে কয়েকটি গুলি গেল, সাথে সাথে হেলিকপ্টারটা উভয় পাশে গড়ান দিল। খোলা র্যাবম্প দিয়ে যেন পড়েই গিয়েছিলাম বলে মনে হলো। কর্নেল রব গুলিবিদ্ধ হয়ে মেঝেতে পরে যান। আমি ছাড়া মনে হলো অন্যরা সকলেই আহত। ডাক্তার জাফর উল্লাহ তৎক্ষণাৎ মেঝেতে পড়া কর্নেল রবের পাশে বসে তাঁকে দেখছেন, বেশ রক্তপাত হচ্ছে। আমার ধ্যান তেলের ট্যাঙ্কের দিকে, দুটি ছিদ্র দিয়ে তেল বয়ে পড়ছে। নির্বোধের মত হাত দিয়ে থামাতে গিয়ে আমার হাতে ফোসকা পড়ল। তখন প্রবাসী বাঙ্গালীদের প্রেরিত আমার বৃষ্টি ও বাতাস হতে রক্ষাকারী জ্যাকেট দিয়ে তেল প্রবাহ থামাবার আপ্রাণ চেষ্টা করি। এদিকে ওয়ারেন্ট অফিসার যন্ত্রপাতি চেক করছেন। ডাঃ জাফর উল্লাহ হাত দিয়ে দেখলেন কর্নেল রব নাড়ীহীন। তবুও তিনি তাঁর বুকে কি যেন করছিলেন। হেলিকপ্টার গতি পরিবর্তন করে যেন ঘুরছে। সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে এসেছে। কিছুক্ষণেই তেল প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেল এবং সকলেই আমার দিকে তাকাচ্ছেন। তারা যেন আমার মনোবল কি বা মনে বল কতটুকু মাপছেন। এড়াবার জন্য পাইলটের ‘ককপিটে’ গিয়ে বললাম, ‘Son our number seems to up’ তরুণ পাইলট গেজএর দিকে তাকয়ে বললো ‘শেষ হয়েছে’। আমি তার কাঁধে হাত দিয়ে বললাম, ‘Don’t worry, take it easy, it has to come for every one why did you go into a swing?’ (ঘাবড়িয়োনা, সকলকেই একদিন যেতে হবে। তুমি হেলিকপ্টারকে গড়িয়ে ছিলে কেন?) সহ-পাইলট বললো, ‘There is something in the air, Sir.’ (আকাশে কি যেন ছিল,স্যার)। আমি তখন বেশ চিন্তিত। বললাম, ‘See if you come get down any where’ (দেখে একটি জায়গায় নেমে যাও)। তখনো আমার হাতটা ছেলেটার ঘাড়ে, জানিনা এতে সে স্বস্থিবোধ করছিল কি না। আমারা ঘুরে ঘুরে নামারই চিন্তা করছিলাম, এমন সময় একটা উজ্জ্বল নগরী যেন কোথা হতে নিচে ভেসে উঠলো। হঠাৎ মাথায় ঢুকলো না এটা কোন জায়গা। চিন্তা, কোন সময় হেলিকপ্টারের ইঞ্জিন বন্ধ হবে বা আগুন লেগে খাড়া ভাবে ভূমিতে পড়ে একটা বিস্ফোরণ হবে। অন্ধকারে পাইলট নামার চেস্টা করলে আমি একবার বিরাট জলাশয় ও একবার বিরাট পাহাড় দেখে উপরে উঠে যেতে বললাম। হঠাৎ মনে হলো ‘Landing light’ এর কথা। বলতেই পাইলট টা জ্বালালো এবং আমরা একটা ধান শূন্য খেতের উপর নিজেদের পেয়ে বললাম, ‘এখানেই নামো’। পাইলট অতি স্থির ও শান্তভাবে হেলিকপ্টার নামালো। নামার সাথে সাথে আপনাআপনি পাখা বন্ধ হয়ে গেল। আমরা জানিনা কোথায়, আমি প্রথমে লাফ দিয়ে নামি, কোথায় এলাম দেখতে। নেমে দেখি ফেঞ্চুগঞ্জ ব্রিজের সন্নিকটে, লোকজন এসে ভীড় করলে তাদের একটি চৌকি আনতে বলি। ইতিমধ্যে, ডাক্তার জাফর উল্লাহ কর্নেল, রবকে নামালেন। এবং বললেন, ‘Sir. His pulse is back’। তাঁর কথায় কিছুটা আশ্বস্হ হয়ে মহান সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ জানালাম।
এমন সময় মিত্র বাহিনীর মাউন্টেন ডিভিশনের এক ফুল কর্নেল এসে উপস্থিত। তিনি কুশিয়ারা পার হচ্ছিলেন। হেলিকপ্টারটা সংকটাপন্ন অবস্থায় নামতে দেখে এসেছিলেন। তিনি একটা এম্বুলেন্স গাড়িও যোগাড় করলেন। আমরা হেঁটে এবং কর্নেল রবকে মাইজগাঁও রেলস্টেশনে এ.এস.ডি (এডভান্সড ড্রেসিং স্টেশনে) ডাক্তারের নিকট পৌঁছাই। তারপর জীপে করে রেললাইনের উপর দিয়ে মৌলভীবাজার যাবার উদ্দেশ্যে কুলাউড়া অভিমুখে রওয়ানা দেই।
ভারতীয় তরুণ পাইলটকে আমার লেখায় তাদের সামরিক পদকে ভূষিত করা হয়।”
১৬ই ডিসেম্বর পাক বাহিনীর ঢাকায় আত্মসমর্পণ করছে যৌথ বাহিনীর কমান্ডার অরোরার কাছে, ঠিক সে সময় মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক কে হত্যা করার জন্য গুলি করা হয় তাঁর বিমানে। আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে ওসমানীর অনুপস্থিতির রহস্য উন্মোচিত হলেও তাঁকে হত্যা করার চেষ্টার রহস্য উন্মোচিত হয়নি এখনও। জেনারেল ওসমানী আকার ইঙ্গিতে ও কোন আভাস দেননি এই হামলাকারী কারা হতে পারে। বাংলাদেশ সরকার ও কোন মন্তব্য বা কোন তদন্তের ব্যবস্থা করেননি। আমরা এক আজব দেশের লোক স্বাধীনতা যুদ্ধের সর্বাধিনায়ক কে হত্যার চেষ্টা করা হলো কিন্তু কোন প্রতিক্রিয়া নেই।
আমি এই লেখাটি লিখছি ২০০৭ ইং সনের অক্টোবর মাসে বসে। সেই হিসাবে প্রায় ৩৬ বৎসর কেটে গেল। বাংলাদেশে অনেক সরকার ক্ষমতায় এসেছে এবং চলে গেছে কিন্তু এই ঘটনা সম্পর্কে কোন সরকার কিছু বলেনি।
আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়কের অনুপস্থিতি সম্পর্কে আরো কিছু রথি-মহারথিদের বক্তব্য শুনা যেতে পারে।
২৭শে মার্চ দৈনিক ইনকিলাব পত্রিকায় জেনারেল অরোরার একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেন সাবেক মন্ত্রী বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া। সাক্ষাৎকারে অরোরা বলেছেন-
“বাংলাদেশ স্বাধীনতা যুদ্ধে দেশের সেনাবাহিনী এবং যে লাখ লাখ মুক্তিযোদ্ধা নয় মাস যুদ্ধ করলো, জীবন দিলো, তাদের অবদানের ব্যপারে তোমাদের তখনকার সরকার প্রধান তো কিছু বলেননি। আত্মসমর্পণের দলিলটা দিল্লী থেকে পাঠিয়েছিলেন জেনারেল জ্যাকভ। দলিল তৈরিতে আমার কোন হাত ছিল না। আর আমার কোন রূপ ইচ্ছাও ছিল না মুক্তিযোদ্ধাদের কে কোনো ভাবে হেয় করার। আত্মসমর্পণের দিনে আমি জেনারেল ওসমানীকে খুঁজেছি। তিনি কোন রূপ ইনফর্

লিখেছেন,   মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক আতাউল গনি ওসমানীর একজন সহযোদ্ধা 

Facebook Comments

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



» কুয়েত প্রবাসী আওয়ামীলীগ নেতা মুজিব আর নেই

» এমপি নিক্সন চৌধুরীর বিরুদ্ধে মামলা

» কুয়েতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশনের সাক্ষাৎ ও মতবিনিময়

» অধ্যাদেশে রাষ্ট্রপতির সই, ধর্ষণের শাস্তি এখন মৃত্যুদণ্ড

» বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত ৮ জন পেলেন ব্রিটিশ রানির খেতাব

» ধর্ষণ মামলার দ্রুত নিষ্পত্তিতে প্রধান বিচারপতির নির্দেশনা চাইব: আইনমন্ত্রী

» ভূমিকম্পে কেঁপে উঠলো মৌলভীবাজার

» শনিবার থেকে নিজের নির্বাচনী প্রচার শুরু করতে যাচ্ছেন ট্রাম্প

» উচ্চ মাধ্যমিক ও সমমানের পরীক্ষা হচ্ছেনা

» নোয়াখালীতে নারী নির্যাতন: আরও দুজন গ্রেপ্তার

Agrodristi Media Group

Advertising,Publishing & Distribution Co.

Editor in chief & Agrodristi Media Group’s Director. AH Jubed
Legal adviser. Advocate Musharrof Hussain Setu (Supreme Court,Dhaka)
Editor in chief Health Affairs Dr. Farhana Mobin (Square Hospital, Dhaka)
Social Welfare Editor: Rukshana Islam (Runa)

Head Office

Mahrall Commercial Complex. 1st Floor
Office No.13, Mujamma Abbasia. KUWAIT
Phone. 00965 65535272
Email. agrodristi@gmail.com / agrodristitv@gmail.com

Desing & Developed BY PopularITLtd.Com
,

১৬ই ডিসেম্বর আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক ওসমানীকে হত্যা চেষ্টার রহস্য উন্মোচিত হয়নি 

অগ্রদৃষ্টি ডেস্কঃ ১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১সালে পাকবাহিনীর আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক বঙ্গবীর জেনারেল মহাম্মদ আতাউল গণী ওসমানী কেন অনুপস্থিত ??
জাতীয় জনতা পার্টির প্রধান, বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক জাতীয় সংসদ সদস্য, এডভোকেট মোঃ নূরুল ইসলাম খান।
১৬ই ডিসেম্বর পাকবাহিনী আত্মসমর্পণ করে ভারতীয় বাহিনীর পূর্বাঞ্চল কমান্ডের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার নিকট। জেনারেল অরোরা একাত্তরের ৩রা ডিসেম্বর থেকে মিত্রবাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর যৌথ কমান্ডের একক কমান্ডার ছিলেন। আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়কের অনুপস্থিতি দেশবাসীকে মর্মাহত করেছে।
উক্ত অনুষ্ঠানে দর্শকের ভূমিকায় উপস্থিত ছিলেন ডেপুটি চীপ-অব-স্টাফ গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ.কে খন্দকার। অনুষ্ঠানে ওসমানীর অনুপস্থিতি নিয়ে অনেকেই অজ্ঞতাপ্রসূত মনগড়া কথা বলেছেন। কেউ কেউ ওসমানীকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য উদ্দেশ্যমূলক ভাবে বিকৃত তথ্য দিয়ে সকলকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছেন।
নয় মাস কঠিন যুদ্ধ পরিচালনা করে রণাঙ্গন থেকে রণাঙ্গনে ছুটে গিয়ে যিনি দেশ শত্রুমুক্ত করলেন, হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের সময় তিনিই উপস্থিত থাকতে পারলেন না। এ এক জটিল ঘটনা, একটি রহস্যাবৃত বিষয়। কুচক্রী মহল বারংবার এ নিয়ে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে অনেক কাহিনীর সৃষ্টি করেছে ।
অনেক বিজ্ঞ, অভিজ্ঞ, তাত্ত্বিক, কবি, সাহিত্যিক, অধ্যক্ষ, রাজনৈতিক ব্যক্তি এই গঠনাকে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে জনসমক্ষে উপস্থাপন করেছেন। একজন হলেন কলম সুন্দর চাটুকার লেখক এম.আর.আক্তার মুকুল ‘আমি বিজয় দেখেছি’ বইটিতে লিখেছেন-
“১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর দুপুর প্রায় বারো’টা নাগাদ কোলকাতাস্থ থিয়েটার রোডে মুজিবনগর সরকারের অস্থায়ী সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তাজ উদ্দিন আহমদের কাছে খবর এসে পৌঁছালো, ঢাকায় হানাদার বাহিনী আত্মসমর্পণ করতে সম্মত হয়েছে। আজ বিকেলেই ঢাকায় আনুষ্ঠানিক ভাবে আত্মসমর্পণ হবে। মুজিবনগর সরকারের পক্ষ থেকে এই অনুষ্ঠানে প্রতিনিধিত্ব করার জন্য উচ্চপদস্থ কাউকে উপস্থিত থাকতে হবে। ………………..প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীনকে তখন কিছুটা চিন্তিত দেখাচ্ছিল। ……………………প্রধানমন্ত্রী তাঁকে (জেনারেল ওসমানী) দেখে আনন্দে এক রকম চিৎকার করে উঠলেন, সি-ইন-সি সাহেব ঢাকায় সর্বশেষ খবর শুনেছেন বোধহয়?
এখনতো আত্মসমর্পণের তোড়জোড় চলছে। ……………………প্রধানমন্ত্রী বাকী কথাগুলো শেষ করতে পারলেন না। ওসমানী সাহেব তাঁকে করিডোরের আর এক কোণায় একান্তে নিয়ে গেলেন। দুজনের মধ্যে মিনিট কয়েক কি কথাবার্তা হলো, আমরা তা শুনতে পেলাম না। …………… ওসমানী সাহেবের শেষ কথাটুকু আমরা শুনতে পেলাম- ‘নো নো প্রাইম মিনিস্টার, মাই লাইফ ইজ ভেরী প্রেশাস, আই কান্ট গো’।”
এই কলম সুন্দর মুকুলের লেখার প্রেক্ষিতে আরেকটি লেখা উত্থাপন করা অপরিহার্য বলে মনে করি। আওয়ামীলীগের এম.এন.এ. মোহাইমেন ‘ঢাকা-আগরতলা-মুজিবনগর’ গ্রন্হের ১৬০পৃঃ লিখেছেন-
“১৬ই ডিসেম্বর পাকবাহিনী আত্মসমর্পণ করবে, শুনে ছুটে গেলাম আঁট নং থিয়েটার রোডে তাজউদ্দিন সাহেবের সাথে দেখা করার জন্য। তিনি হয়তো ততক্ষণে ঢাকায় চলে গেছেন অথবা যাত্রার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কিন্তু গিয়ে দেখলাম তাজউদ্দিন সাহেব স্বাভাবিক পোষাকে বসে আছেন। তিনি কখন যাবেন জিজ্ঞাসা করায় বললেন তিনি যাবেন না। তখন আমি আশ্চর্য্য হলাম। এতদিন পর দেশ স্বাধীন হচ্ছে, শত্রু বাহিনী আত্মসমর্পণ করছে এ সময় প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন না ব্যাপারটা আমার কাছে মোটেই বোধগম্য হলো না। কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন- ‘শেখ মণি ও মুজিব বাহিনীর সঙ্গে আমার সম্পর্ক তো আপনার জানা আছে। সৈন্যবাহিনীতে আমার শুভাকাঙ্খীদের কাছ থেকে আমি জানতে পেরেছি এই মুহূর্তে ঢাকায় সম্পূর্ণ অরাজক অবস্থা চলছে। ঠিক এসময় ঢাকায় কোন জনসমাবেশের মধ্যে আমার উপস্থিত থাকা মোটেও নিরাপদ নয়। জনতার ভিড়ের মধ্যে মুজিব বাহিনীর লোকেরা যে কোন মুহূর্তে আমাকে গুলি করে হত্যা করে ফেলতে পারে কিন্তু দোষ চাপিয়ে দিতে পারে আল-বদর, আল-শামসের ঘাড়ে এবং লোকেরাও সেটা বিশ্বাস করবে। তাই আমার শুভাকাঙ্খীরা বলেছে, ঢাকার অবস্থা মোটামোটি আয়ত্বে আসলে তারা আমাকে জানাবে এবং আমি আশাকরি দু’একদিনের মধ্যে আমি যেতে পারব।’ ওসমানী সাহেব যাচ্ছেন কিনা জিজ্ঞাস করায় তিনি বললেন-‘তিনিও যাচ্ছেন না’।”
ওসমানীর পি.আর.ও. নজরুল ইসলামের বক্তব্যঃ-
“ঢাকার আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে মুজিবনগর সরকারের পক্ষ থেকে কে উপস্থিত থাকবেন- এ নিয়ে যখন নানা গুজব ও কানাঘুষা চলছিলো, সে সময় জেনারেল ওসমানী কলকাতায় অনুপস্থিত। তিনি কোথায় গেছেন বা কোথায় ছিলেন তা কেউ ভাল করে জানেনও না। এমনকি আমিও জানি না। তার দপ্তরের কোন সামরিক কর্মকর্তা এ সম্পর্কে মুখ খুলছেন না।
আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানের দু’দিন পর জেনারেল ওসমানী মুজিবনগর সদর দপ্তরে ফিরে আসেন। তাঁকে আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে অনুপস্থিত থাকার কারণ জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন- ‘দেখুন আমরা স্বাধীনতা অর্জন করতে যাচ্ছি। কিন্তু দুঃখ হলো স্বাধীন জাতি হিসাবে আমাদের মধ্যে আত্মমর্যাদাবোধ সম্পর্কে কোন চেতনা এখনো জন্ম হয়নি। ঢাকায় আত্মসমর্পণের অনুষ্ঠানে আমার যাওয়ার কোন প্রশ্নই উঠে না। কারণ, এই সশস্ত্র যুদ্ধ ভারত-বাংলাদেশের যৌথ কমান্ডের অধীনে হলেও যুদ্ধের অপারেটিং পার্টির পুরো কমান্ডে ছিলেন ভারতীয় সেনা প্রধান লেঃ জেনারেল শ্যাম মানেকশ্। আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে জেনারেল মানেকশ্’কে রিপ্রেজেন্ট করবেন লেঃ জেনারেল অরোরা। আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে মানেকশ্‌ গেলে আমার যাবার প্রশ্ন উঠত। সার্বভৌম ক্ষমতার ভিত্তিতে আমার অবস্থান জেনারেল মানেকশ্‌র সমান। সেখানে মানেকশ্‌র অধীনস্থ আঞ্চলিক বাহিনীর প্রধান জেনারেল অরোরার সফরসঙ্গী আমি হতে পারি না। এটা কোন দেমাগের কথা নয়। এটা প্রটোকলের ব্যাপার। আমি দুঃক্ষিত, আমাকে অবমূল্যায়ন করা হয়েছে। আমাদের মধ্যে আত্মমর্যাদার বড় অভাব।
ঢাকার ভারতীয় বাহিনী আমার কমান্ডে নয়, জেনারেল মানেকশ্‌র পক্ষে জেনারেল অরোরার কমান্ডের অধীনে ঢাকায় ভারতীয় সেনাবাহিনী। পাকিস্তানী সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করবে যৌথ কমান্ডের অধীনে ভারতীয় বাহিনীর কাছে। আমি সেখানে (ঢাকায়) যাব কি জেনারেল অরোরার পাশে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখার জন্য? হাউ ক্যান।
আত্মসমর্পণ দলিলে স্বাক্ষর করবেন জেনারেল মানেকশ্‌র পক্ষে জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা আর পাকিস্তানী বাহিনীর পক্ষে জেনারেল নিয়াজী। এখানে আমার ভূমিকা কি? খামোখা আমাকে নিয়ে টানা হেঁচড়া হচ্ছে।”
এ হচ্ছে আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে ওসমানীর অনুপস্থিতি সম্পর্কে বিভিন্ন লেখকের মূল্যায়ন।
বঙ্গবীর জেনারেল মহম্মদ আতাউল গণী ওসমানী সাহেবের সাথে পরিচয়কালীন স্মরণীয় দিনগুলিঃ-
জেনারেল ওসমানীর সঙ্গে আমার পরিচয় ১৯৭০ সালে। ঐ সময় তিনি রাজনীতিতে যোগদান করেন। ডিসেম্বর মাসে সাধারণ নির্বাচনে বিশ্বনাথ, বালাগঞ্জ, গোলাপগঞ্জ ও ফেঞ্চুগঞ্জ নির্বাচনী এলাকা থেকে তিনি জাতীয় পরিষদ সদস্য নির্বাচিত হন। নির্বাচনকালীন আমি বিশ্বনাথ থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলাম। যার জন্য তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুযোগ হয়েছিল এবং সেই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ১৯৮৪ সনে চিকিৎসার জন্য তাঁর লন্ডন যাওয়া পর্যন্ত এবং লন্ডনে তাঁর মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত ছিল। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন প্রবাসী বাঙ্গালীদেরকে সহযোগীতা করার জন্য প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার ও ব্রিটিশ সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় করিমগঞ্জে একটি ইমিগ্রেশন এডভাইজারী কমিটি গঠন করা হয়। যার প্রধান ছিলেন জনাব আব্দুর রহিম এম.আন.এ. এবং আমি ছিলাম তাঁর সম্পাদক। প্রবাসীদের সমস্যা ছিল সীমিত, শেষ দিকে কিছু সমস্যা সমাধানের জন্য আমি আগস্ট মাসের মাঝামাঝি কলকাতা যাই। এই সময় ওসমানী সাহেব, আমি কলকাতায় আছি সংবাদ পেয়ে বার বার তাঁর সঙ্গে দেখা করার জন্য আমাকে খবর দেন। এক সময় তাঁর সঙ্গে দেখা করি। এরপর থেকে প্রায়ই তাঁর সঙ্গে দেখা করতে হতো। কোন দিন না গেলে তিনি গাড়ি পাঠিয়ে আমাকে নেওয়াতেন। তিনি আমাকে বিভিন্ন এসাইনমেন্ট দিতেন, অলিখিত ভাবে তাঁর ব্যাক্তিগত সহকারীরও কাজ করতাম। এই সময় তাঁর বিভিন্ন ঘটনা এবং তাঁর সম্পর্কে নানা রকম সংবাদ পেতাম।
জেনারেল ওসমানী ছিলেন অত্যন্ত আত্মমর্যাদা সচেতন ব্যক্তিত্ব। নিজ দেশের স্বাধীন সত্ত্বা সম্পর্কে তাঁর অহঙ্কার ছিল। তিনি যে দেশের কমান্ডর-ইন-চীফ সেই প্রটোকলের প্রতি তাঁর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ছিল। আমি তাঁর সঙ্গে বসে গল্প করার সময় মাঝেমাঝে আর্মি অফিসাররা আসতেন, তখন আমি অফিস রুমের একপাশে একটা সোফাসেট ছিল, সেখানে বসে পত্রিকা পড়তাম। একদিন দেখলাম ইন্ডিয়ান দু’জন আর্মি অফিসার আসলেন, ওসমানী সাহেবকে স্যালুট করলেন। চেয়ারে বসে অনেকক্ষণ কথা বললেন, ঐ সময় ওসমানী সাহেব তাঁর নিজের চেয়ার খালি রেখে অন্য একটা চেয়ারে বসে কথা বলছিলেন। এই দেখাটা আমার চোখে প্রথমে ভুল মনে করেছিলাম কিন্তু আরও দু’এক দিন প্রত্যক্ষ করে দেখলাম যে ঘটনা ঠিকই। ঐ অফিসাররা কোন র্যাতঙ্কের ছিলেন আমার খেয়াল নাই। তারপর আমি ওসমানী সাহেবকে কথাটা জিজ্ঞাসা করলে তিনি মৃদু হেসে প্রথমে বললেন ‘আপনি বসে বসে এইগুলি দেখেন বুঝি’ তারপর বললেন, ‘আমরা সবাই ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান আর্মিতে কর্মরত ছিলাম। এই অফিসাররা আমর সিনিয়র ছিল কিন্তু এখন আমি একটা দেশের কমান্ডার-ইন-চীফ হওয়ায় তারা আমাকে স্যালুট করেছে। আমি আমার চেয়ারটা খালি রেখে তাহাদেরকে সম্মানটুকু দেখালাম’।
আরেকদিন সন্ধ্যার পর আমি ওসমানী সাহেবের অফিসে গেছি। তখন তিনি কয়েকজন বিদেশীদের সঙ্গে কথা বলেছেন। আমি তাঁর এ.ডি.সি. ক্যাপ্টেন নূরের অফিসে গিয়ে বসেছি। ক্যাপ্টেন নূর বললেন ‘আজকের কেবিনেট মিটিংয়ে ওসমানী সাহেবের প্রশ্নের জবাব দিতে দিতে ডি.পি.ধর. ১৬বার পানি খেয়েছেন।’ ডি.পি.ধর. মিসেস গান্ধীর প্রতিনিধি হয়ে বাংলাদেশ কেবিনেট মিটিংয়ে বসতেন। আমি নূরকে জিজ্ঞাসা করলাম, ইস্যুটা কি ছিল? অনেক ইস্যুর মধ্যে একটা ইস্যু ছিল বাংলাদেশ সরকারের অনুমতি ছাড়া ছাত্রনেতাদের অস্ত্র দেওয়া। তখন আমি বললাম নজরুল ইসলাম ও তাজ উদ্দিন সাহেব তারা কি বললেন। নূর বললেন, নজরুল ইসলাম সাহেব বসে মৃদু হাসলেন এবং তাজ উদ্দিন সহ অন্যরা দু’একটা কথা বলেছিলেন। যার জন্য ওসমানী সাহেবের কথার কোন ফললাভ হয়নাই। পরে এই প্রসঙ্গে আমি ওসমানী সাহেবকে জিজ্ঞাসা করলে, তিনি বললেন, ‘ছাত্রনেতাদেরকে সরকারের অনুমতি ছাড়া অস্ত্র দেওয়ায় আমাদের অস্থায়ী প্রেসিডন্ট ও প্রধানমন্ত্রী ক্ষিপ্ত কিন্তু শক্তভাবে কিছু বলতে পারেননি।’ এই প্রসঙ্গটি আনলাম কারণ আমাদের প্রবাসী সরকার কোন শক্ত ভূমিকা নিতে পারেন নাই। যারজন্য মুক্তিযুদ্ধকালীন অনেক বিষয় নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন।
মুজিবনগর সরকারের অনেক কর্মকর্তা ওসমানী সাহেবের দপ্তর থেকে প্রত্যাখাত হয়ে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে আশ্রয় নিতেন। উধাহরণ স্বরূপ, মেজর জেনারেল নূরুল ইসলাম শিশু ও মেজর আবু ওসমান চৌধুরীর নাম বলা যায়। তাছাড়া কেউ কেউ ওসমানী সাহেবের নিকট থেকে অবৈধ সুযোগ সুবিধা না পেয়ে তাঁকে হেয় করার প্রয়াস চালাতেন এবং অদ্যাবধি তা চালিয়ে যাচ্ছেন, এদের মধ্যে এম.এর. আক্তার মুকুল একজন।
আমি জেনারেল ওসমানীর সঙ্গে ৭১সালের ১৩ই ডিসেম্বর সন্ধ্যা থেকে ১৫ই ডিসেম্বর দুপুর পর্যন্ত ছিলাম। নভেম্বর মাসের শেষ দিকে আমি কলকাতা থেকে করিমগঞ্জ আসতে চেয়েছিলাম, কিন্তু ওসমানী সাহেব আমাকে আসতে দেন’নি, বললেন, দেশ স্বাধীন হয়ে যাবে একসঙ্গে চলে যাব। ৩রা ডিসেম্বর ইন্ডিয়া যুদ্ধ আরম্ভ করার পর তাড়াতাড়ি চলে আসার জন্য করিমগঞ্জ করিমগঞ্জ থেকে আমার সহযোগীরা ৮/১০ টা টেলিগ্রাম করেন। আমি ওসমানী সাহেবকে টেলিগ্রামের কথা বললাম, তিনি আমাকে বললেন, ‘আপনি স্ট্যান্ড বাই থাকেন, আমি আপনাকে বিমানে করে সিলেট নামিয়ে দেব, করিমগঞ্জে টেলিগ্রাম করে সকলকে বলে দেন, তারা যেন এলাকায় চলে যায়।’ আমি ওসমানী সাহেবের কথার উত্তরে কিছুই বলতে না পেরে, তাই করলাম।
১৩ই ডিসেম্বর আমাকে ফোন করে বললেন, ‘আপনি তৈরি হন, ঘণ্টাখানেকের মধ্যে আমর গাড়ি আপনাকে নিয়ে আসবে।’ রাত্রি নয় ঘটিকায় তাঁর গাড়ি আমাকে তুলে নিয়ে গেল। অফিসে যাবার পর, তিনি বললেন, ‘কষ্ট করে এখানে ডালভাত খেয়ে ঘুমাতে হবে সকালে সিলেট রওয়ানা দিব।’
১৪ই ডিসেম্বর সকালে তাহার বিশেষ বিমানে দমদম এয়ারপোর্ট হতে রওয়ানা দিলাম। আমাদের সঙ্গে ছিলেন লেঃ কর্নেল এম.এ.রব, ইন্ডিয়ান ব্রিগেডিয়ার উজ্জ্বল গুপ্ত, ডাঃ জাফরউল্লা চৌধুরী, ওসমানী সাহেবের পি.এস. শেখ কামাল, মোস্তফা আল্লামা, মাওলানা শেখ মোঃ উবায়েদ উল্লা-বিন-সাঈদ জালালাবাদী ও আরও দু’এক জন। ওসমানী সাহেব আমাদেরকে সঙ্গে নিয়ে কয়েকটা রণাঙ্গন পরিদর্শন করেন। বাগাডুগরা এয়ারপোর্টে ঘাসের মধ্যে বসে দিনাজপুর সেক্টরের অফিসার ও জোয়ানদের সঙ্গে আমরা লাঞ্চ (মধ্যাহ্ন ভোজ) করি। দিনাজপুরের এম.এন.এ মুজিবুর রহমানসহ কয়েকজন ইন্ডিয়ান আর্মি অফিসার লাঞ্চে (মধ্যাহ্ন ভোজে) আমাদের সঙ্গে শরিক হন। সন্ধ্যায় গৌহাটি পৌঁছি এবং রাত্রি যাপন করি।
১৫ই ডিসেম্বর সকালে গৌহাটি থেকে বিমান ছাড়ার পর ওসমানী সাহেব আমাকে ডেকে তাঁর পাশে বসান এবং বলেন, সিলেট বিমানবন্দর পুরোপুরি ক্লিয়ার হয় নাই। যার জন্য তিনি কুমিল্লা চলে যাবেন এবং সেখান থেকে পরে সিলেট আসবেন। আমাকে তাঁর সঙ্গে যাবার জন্য বললেন। করিমগঞ্জে আমার সহযোগীদের সঙ্গে মিলিত হওয়ার জন্য উদগ্রীব থাকায় আমাকে কুম্বীগ্রাম বিমান বন্দরে নামিয়ে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করি। এই সময় ওসমানী সাহেব বলেন, পাকবাহিনী খুব তাড়াতাড়ি আত্মসমর্পণ করবে। দুপুরের দিকে বিমান কুম্বীগ্রাম বিমান বন্দরে অবতরণ করলে আমিসহ আরও দুইজন বিমান থেকে নামলাম। বিমান বন্দরে একজন ইন্ডিয়ান মেজর ওসমানী সাহেবকে স্বাগত জানালেন। আমাদের সবার ইচ্ছানুযায়ী মুক্তাঞ্চলে পৌঁছে দেওয়ার জন্য ওসমানী সাহেব ঐ মেজরকে নির্দেশ দিলেন। বিমান থেকে নামার সময় ওসমানী সাহেব আমার হাতে একটা চিরকুট দিলেন, চিরকুটটি নিয়ে মেজরের গাড়িতে উঠলাম। ওসমানী সাহেব কুমিল্লার দিকে রওয়ানা দেওয়ার পরে আমরা শিলচরের দিকে রওয়ানা দিলাম। রাস্তায় তাঁর স্বহস্তে লেখা চিরকুটটি দেখলাম। আমি যে বিমানে কুম্বীগ্রাম পৌছেছি এবং মুক্তাঞ্চলে যাওয়ার পথে যে কোন প্রকার সাহায্য করার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে তা চিরকুটে লেখা ছিল। চিরকুটের কপিটি নিম্নরূপঃ-
তারপরের বক্তব্য ওসমানী সাহেবের নিজস্বঃ-
“ ……………আমি তখন রণাঙ্গনে সফররত। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার বিশেষ করে অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট এবং প্রধানমন্ত্রী তথা প্রতিরক্ষা মন্ত্রী জানতেন আমাকে কোথায় পাওয়া যাবে। তাছাড়া মিত্র বাহিনীর উচ্চতম কর্মকর্তারাও জানতেন আমি কোথায়। তা-সত্ত্বেও আমাকে কেন খবর দেয়া হয় না। বরং গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার প্রধান আমার ডেপুটি চীফ-অব-স্টাফ তদানীন্তন গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ.কে.খন্দকারকে পাঠান। ঐ দিন ও এর আগের দিন আমি ময়নামতির রণাঙ্গনে এবং ১৬ই ডিসেম্বর দুপুরে লেঃ জেনারেল স্বাগত সিংহের সাথে মধ্যাহ্ন ভোজন করি। ১৬ই ডিসেম্বর দুপুরের পর তদানীন্তন লেঃ কর্নেল সফি উল্লাহর অধিনায়কত্বে ‘এস’ ফোর্স রণাঙ্গন পরিদর্শন করার জন্য আমার যাওয়ার কথা ছিল। জেনারেল স্বাগত সিংহ সেদিন না যেতে অনুরোধ করেন, বলেন, যে ‘এস’ ফোর্স পরিদর্শনে অসুবিধা হতে পারে, যেহেতু তারা অগ্রসর হচ্ছেন। আমি তখন আমার সফরসূচী পরিবর্তন করে সিলেট ‘জেড’ ফোর্স 2013পরিদর্শনে যাবার সিদ্ধান্ত নেই”।
উপরোক্ত বাস্তব তথ্য ও পরবর্তী ঘটনাবলী হতে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, উভয় ভারতীয় ও গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের শীর্ষপর্যায়ের মহান ব্যক্তিবর্গ (স্ব স্ব কারণে বা উদ্দেশ্যে) চাইতেন না যে, এই আত্মসমর্পণ বাংলাদেশ তথা মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়কের নিকট হোক, যদিও মুক্তিবাহিনী (নিয়মিত ও অনিয়মিত) সুদীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধ করেছিল এবং তাদের সর্বাধিনায়ক কেবিনেট মন্ত্রী সমপর্যায়ের মর্যাদার অধিকারী ছিলেন।
(সূত্রঃ মুজিবুর রহমান হিরু সম্পাদিত ‘বঙ্গবীর ওসমানী’ নামক পুস্তিকা, ওসমানীর সাক্ষাৎকার, রোববার ২৩শে মার্চ, ১৯৮০ স্বাধীনতা দিবস সংখ্যা )
ওসমানী অপরাহ্নে হেলিকপ্টার যোগে সিলেট রওয়ানা দেন এবং রাস্তায় তাঁর হেলিকপ্টারে গুলি করা হয়। তাঁর বিমানে গুলি হওয়ার ঘটনা ওসমানী সাহেব তাঁর জীবনে বিশেষ ঘটনার স্মৃতি হিসাবে নিম্নোক্ত ভাবে উল্লেখ করেছেনঃ-
“১৬ই ডিসেম্বর দুপুরের পরপরই ‘জেড’ ফোর্স পরিদর্শনে আমার সিলেট সফরে যাবার কথা। বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর দুটি ছোট ছোট হেলিকপ্টারে আগরতলা বিমান ঘাঁটি পৌঁছালে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর স্কোয়ার্ডন লিডার সুলতান মাহমুদ জানান যে, আমাদের ছোট দুটি হেলিকপ্টারের পরিবর্তে তিনি ভারতীয় বিমান বাহিনীর একটি বড় রুশী হেলিকপ্টার বন্দোবস্ত করেছেন। বিমান ঘাঁটিতে হঠাৎ করে কয়েকজন বিদেশী সাংবাদিক আমাকে ঘিরে ধরলে সময় নষ্ট হয়। তারপর সমবেত বৈমানিকদের নিকট থেকে বিদায় নেবার জন্য সুলতান কিছু সময় নষ্ট করে ফেললেন। কেন যেন মনে হলো, সুলতানকে বললাম “আমাদেরকে রেখে এই হেলিকপ্টার যদি সময় মতো না ফেরে তবে খবর নিও। প্রয়োজন হলে নিজে হেলিকপ্টার নিয়ে এসো। হেলিকপ্টারে উঠতে বিকেল ৪টার ঊর্ধে হয়ে যায়। হেলিকপ্টারের পেছনের “র্যা ম্প” খোলা ছিল। হেলিকপ্টারে ভারতীয় বিমান বাহিনীর দুজন তরুণ অফিসার একজন পাইলট এবং আরো একজন সহ-পাইলট, তৎসহ কেরালার অধিবাসী একজন ওয়ারেন্ট অফিসার ছিলেন। পাইলটদের বললাম যে, সিলেট বিমান ঘাঁটিতে যাব না, মাইন বা বাঁধা থাকতে পারে। আমরা যাব মেজর (পরে লেঃ কর্নেল) জিয়া উদ্দিন, বীর উত্তম এর অধীনে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ১ম ব্যাটালিয়ানের হেডকোয়ার্টারে। আমার জানা মতে, তাঁর হেডকোয়ার্টার সিলেট ‘কেটল ফার্মের’ সন্নিকটে। এর কাছেই কলেজের হোস্টেল, সামনে বিরাট খেলার মাঠ, হেলিকপ্টার নামার উপযোগী। পাইলটকে বললাম সিলেট শহরের নিকটে সুরমা নদীর কাছে পৌছলে আমাকে ডাকবে আমি তোমাকে গাইড করবো। ছেলেটি চলে গেল তার ‘ককপিটে’।
আমার সঙ্গে ছিলেন মুক্তি বাহিনীর ‘চীফ-অফ-দি-স্টাফ’ রূপে আমার সহকারী ও মুক্তিযুদ্ধের উপ-সর্বাধিনায়ক লেঃ কর্নেল (পরে মেজর জেনারেল) এম.এ.রব বীর উত্তম। ভারতীয় কমান্ডের ‘লিয়াজন অফিসার’ ব্রিগেডিয়ার উজ্জ্বল গুপ্ত, ডাক্তার জাফর উল্লাহ চৌধুরী, সাময়িক ভাবে আমার গণসংযোগ অফিসার জনাব মোস্তফা আল্লামা, আমার এ.ডি.সি. সেকেন্ড লেঃ শেখ কামাল। হেলিকপ্টার কিছুক্ষন থেকে তিন সাড়ে তিন হাজার ফুট উপর দিয়ে শান্ত ভাবে চলছে। আমি দাঁড়িয়ে আমার চীফ-অফ-স্টাফ কর্নেল রবের সঙ্গে কথা বলছি, তিনি আমার নিকট বসা। হঠাৎ একটা মৃদু বিস্ফোরণের শব্দে সকলেই চমকে উঠলাম। মশার মত আমার কানের ধার দিয়ে কয়েকটি গুলি গেল, সাথে সাথে হেলিকপ্টারটা উভয় পাশে গড়ান দিল। খোলা র্যাবম্প দিয়ে যেন পড়েই গিয়েছিলাম বলে মনে হলো। কর্নেল রব গুলিবিদ্ধ হয়ে মেঝেতে পরে যান। আমি ছাড়া মনে হলো অন্যরা সকলেই আহত। ডাক্তার জাফর উল্লাহ তৎক্ষণাৎ মেঝেতে পড়া কর্নেল রবের পাশে বসে তাঁকে দেখছেন, বেশ রক্তপাত হচ্ছে। আমার ধ্যান তেলের ট্যাঙ্কের দিকে, দুটি ছিদ্র দিয়ে তেল বয়ে পড়ছে। নির্বোধের মত হাত দিয়ে থামাতে গিয়ে আমার হাতে ফোসকা পড়ল। তখন প্রবাসী বাঙ্গালীদের প্রেরিত আমার বৃষ্টি ও বাতাস হতে রক্ষাকারী জ্যাকেট দিয়ে তেল প্রবাহ থামাবার আপ্রাণ চেষ্টা করি। এদিকে ওয়ারেন্ট অফিসার যন্ত্রপাতি চেক করছেন। ডাঃ জাফর উল্লাহ হাত দিয়ে দেখলেন কর্নেল রব নাড়ীহীন। তবুও তিনি তাঁর বুকে কি যেন করছিলেন। হেলিকপ্টার গতি পরিবর্তন করে যেন ঘুরছে। সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে এসেছে। কিছুক্ষণেই তেল প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেল এবং সকলেই আমার দিকে তাকাচ্ছেন। তারা যেন আমার মনোবল কি বা মনে বল কতটুকু মাপছেন। এড়াবার জন্য পাইলটের ‘ককপিটে’ গিয়ে বললাম, ‘Son our number seems to up’ তরুণ পাইলট গেজএর দিকে তাকয়ে বললো ‘শেষ হয়েছে’। আমি তার কাঁধে হাত দিয়ে বললাম, ‘Don’t worry, take it easy, it has to come for every one why did you go into a swing?’ (ঘাবড়িয়োনা, সকলকেই একদিন যেতে হবে। তুমি হেলিকপ্টারকে গড়িয়ে ছিলে কেন?) সহ-পাইলট বললো, ‘There is something in the air, Sir.’ (আকাশে কি যেন ছিল,স্যার)। আমি তখন বেশ চিন্তিত। বললাম, ‘See if you come get down any where’ (দেখে একটি জায়গায় নেমে যাও)। তখনো আমার হাতটা ছেলেটার ঘাড়ে, জানিনা এতে সে স্বস্থিবোধ করছিল কি না। আমারা ঘুরে ঘুরে নামারই চিন্তা করছিলাম, এমন সময় একটা উজ্জ্বল নগরী যেন কোথা হতে নিচে ভেসে উঠলো। হঠাৎ মাথায় ঢুকলো না এটা কোন জায়গা। চিন্তা, কোন সময় হেলিকপ্টারের ইঞ্জিন বন্ধ হবে বা আগুন লেগে খাড়া ভাবে ভূমিতে পড়ে একটা বিস্ফোরণ হবে। অন্ধকারে পাইলট নামার চেস্টা করলে আমি একবার বিরাট জলাশয় ও একবার বিরাট পাহাড় দেখে উপরে উঠে যেতে বললাম। হঠাৎ মনে হলো ‘Landing light’ এর কথা। বলতেই পাইলট টা জ্বালালো এবং আমরা একটা ধান শূন্য খেতের উপর নিজেদের পেয়ে বললাম, ‘এখানেই নামো’। পাইলট অতি স্থির ও শান্তভাবে হেলিকপ্টার নামালো। নামার সাথে সাথে আপনাআপনি পাখা বন্ধ হয়ে গেল। আমরা জানিনা কোথায়, আমি প্রথমে লাফ দিয়ে নামি, কোথায় এলাম দেখতে। নেমে দেখি ফেঞ্চুগঞ্জ ব্রিজের সন্নিকটে, লোকজন এসে ভীড় করলে তাদের একটি চৌকি আনতে বলি। ইতিমধ্যে, ডাক্তার জাফর উল্লাহ কর্নেল, রবকে নামালেন। এবং বললেন, ‘Sir. His pulse is back’। তাঁর কথায় কিছুটা আশ্বস্হ হয়ে মহান সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ জানালাম।
এমন সময় মিত্র বাহিনীর মাউন্টেন ডিভিশনের এক ফুল কর্নেল এসে উপস্থিত। তিনি কুশিয়ারা পার হচ্ছিলেন। হেলিকপ্টারটা সংকটাপন্ন অবস্থায় নামতে দেখে এসেছিলেন। তিনি একটা এম্বুলেন্স গাড়িও যোগাড় করলেন। আমরা হেঁটে এবং কর্নেল রবকে মাইজগাঁও রেলস্টেশনে এ.এস.ডি (এডভান্সড ড্রেসিং স্টেশনে) ডাক্তারের নিকট পৌঁছাই। তারপর জীপে করে রেললাইনের উপর দিয়ে মৌলভীবাজার যাবার উদ্দেশ্যে কুলাউড়া অভিমুখে রওয়ানা দেই।
ভারতীয় তরুণ পাইলটকে আমার লেখায় তাদের সামরিক পদকে ভূষিত করা হয়।”
১৬ই ডিসেম্বর পাক বাহিনীর ঢাকায় আত্মসমর্পণ করছে যৌথ বাহিনীর কমান্ডার অরোরার কাছে, ঠিক সে সময় মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক কে হত্যা করার জন্য গুলি করা হয় তাঁর বিমানে। আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে ওসমানীর অনুপস্থিতির রহস্য উন্মোচিত হলেও তাঁকে হত্যা করার চেষ্টার রহস্য উন্মোচিত হয়নি এখনও। জেনারেল ওসমানী আকার ইঙ্গিতে ও কোন আভাস দেননি এই হামলাকারী কারা হতে পারে। বাংলাদেশ সরকার ও কোন মন্তব্য বা কোন তদন্তের ব্যবস্থা করেননি। আমরা এক আজব দেশের লোক স্বাধীনতা যুদ্ধের সর্বাধিনায়ক কে হত্যার চেষ্টা করা হলো কিন্তু কোন প্রতিক্রিয়া নেই।
আমি এই লেখাটি লিখছি ২০০৭ ইং সনের অক্টোবর মাসে বসে। সেই হিসাবে প্রায় ৩৬ বৎসর কেটে গেল। বাংলাদেশে অনেক সরকার ক্ষমতায় এসেছে এবং চলে গেছে কিন্তু এই ঘটনা সম্পর্কে কোন সরকার কিছু বলেনি।
আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়কের অনুপস্থিতি সম্পর্কে আরো কিছু রথি-মহারথিদের বক্তব্য শুনা যেতে পারে।
২৭শে মার্চ দৈনিক ইনকিলাব পত্রিকায় জেনারেল অরোরার একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেন সাবেক মন্ত্রী বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া। সাক্ষাৎকারে অরোরা বলেছেন-
“বাংলাদেশ স্বাধীনতা যুদ্ধে দেশের সেনাবাহিনী এবং যে লাখ লাখ মুক্তিযোদ্ধা নয় মাস যুদ্ধ করলো, জীবন দিলো, তাদের অবদানের ব্যপারে তোমাদের তখনকার সরকার প্রধান তো কিছু বলেননি। আত্মসমর্পণের দলিলটা দিল্লী থেকে পাঠিয়েছিলেন জেনারেল জ্যাকভ। দলিল তৈরিতে আমার কোন হাত ছিল না। আর আমার কোন রূপ ইচ্ছাও ছিল না মুক্তিযোদ্ধাদের কে কোনো ভাবে হেয় করার। আত্মসমর্পণের দিনে আমি জেনারেল ওসমানীকে খুঁজেছি। তিনি কোন রূপ ইনফর্

লিখেছেন,   মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক আতাউল গনি ওসমানীর একজন সহযোদ্ধা 

Facebook Comments


এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



আজকের দিন-তারিখ

  • মঙ্গলবার (রাত ২:৫২)
  • ২০শে অক্টোবর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ
  • ২রা রবিউল আউয়াল, ১৪৪২ হিজরি
  • ৪ঠা কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ (হেমন্তকাল)

Exchange Rate

Exchange Rate: EUR

সর্বশেষ খবর



Agrodristi Media Group

Advertising,Publishing & Distribution Co.

Editor in chief & Agrodristi Media Group’s Director. AH Jubed
Legal adviser. Advocate Musharrof Hussain Setu (Supreme Court,Dhaka)
Editor in chief Health Affairs Dr. Farhana Mobin (Square Hospital, Dhaka)
Social Welfare Editor: Rukshana Islam (Runa)

Head Office

Mahrall Commercial Complex. 1st Floor
Office No.13, Mujamma Abbasia. KUWAIT
Phone. 00965 65535272
Email. agrodristi@gmail.com / agrodristitv@gmail.com

Bangladesh Office

Director. Rumi Begum
Adviser. Advocate Koyes Ahmed
Desk Editor (Dhaka) Saiyedul Islam
44, Probal Housing (4th floor), Ring Road, Mohammadpur,
Dhaka-1207. Bangladesh
Contact: +8801733966556 / +8801920733632

Email Address

agrodristi@gmail.com, agrodristitv@gmail.com

Licence No.

MC- 00158/07      MC- 00032/13

Design & Devaloped BY Popular-IT.Com
error: দুঃখিত! অনুলিপি অনুমোদিত নয়।