
রাত তখন গভীর। ঢাকার একটি ছোট্ট ঘরে কান্নার শব্দ। এ কান্না কোনো সিনেমার দৃশ্যের জন্য নয়, এ কান্না হৃদয়ের গভীর থেকে উঠে আসা এক অসহনীয় যন্ত্রণার প্রতিচ্ছবি। একদিকে ঘুমহীন রাত কাটানো এক শোকাহত পরিবার, অন্যদিকে স্বামী হারানোর বেদনা কিছুতেই বিশ্বাস করতে না পারা এক অসহায় স্ত্রী। তিনি বারবার বলছেন, “ভাইয়া, একটু দেখুন, ও হয়তো বেঁচে আছে।” কিন্তু আমি তো জানি, এ কেবলই এক করুণ অভিনয়, যা শুধু এক মুহূর্তের জন্য হলেও মিথ্যে সান্ত্বনা।
ঘটনার সূত্রপাত প্রায় ৫ বছর আগে, যখন মহামারী করোনাভাইরাসের কারণে গোটা পৃথিবী থমকে গিয়েছিল। ইমোতে একটি অচেনা নম্বর থেকে বারবার ফোন আসছিল। বাধ্য হয়েই ফোনটা ধরলাম। ফোনের ওপাশ থেকে এক মহিলার কান্নাভেজা কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, “ভাই, আমি জানি আপনি একজন সাংবাদিক। আমার স্বামী কুয়েতে হার্ট অ্যাটাক করেছেন। প্লিজ, আমাকে একটু সাহায্য করুন।”
খবর নিয়ে জানতে পারলাম, কুয়েতে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন সেই প্রবাসী, যার নাম প্রবাল কান্তি। কিন্তু তার স্ত্রী এখনো বিশ্বাস করতে পারছেন না। হয়তো তার মন চাইছে, এই ঘটনা সত্যি না হোক। হয়তো তার অবুঝ মন চায়, একটু পর তার স্বামী ফোন করে বলুক, “চিন্তা করো না, আমি ঠিক আছি।” কিন্তু বাস্তব বড় কঠিন। এই শোকের মুহূর্তে তাকে মিথ্যা আশা দিতে আমার মন সায় দেয়নি। কারণ আমি জানি, এই ক্ষণিকের সান্ত্বনা কেবলই তার কষ্ট আরও বাড়িয়ে দেবে।

“যার চলে যায় সেই বোঝে হায়, বিচ্ছেদে কি যন্ত্রণা” – এই বাক্যটি আজ আমার কাছে আরও বেশি বাস্তব হয়ে ধরা দিয়েছে। একজন প্রবাসীর জীবন কতটা অনিশ্চিত, তা হয়তো আমরা বাইরে থেকে উপলব্ধি করতে পারি না। তারা নিজের পরিবারকে ভালো রাখতে, একটু সুখের আশায়, নিজের দেশ ছেড়ে দূর প্রবাসে পাড়ি জমান। কিন্তু যখন এমন মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে, তখন শুধু একটি পরিবার নয়, হাজারো স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে যায়।
একদিকে স্ত্রী ও পরিবারের আকুল আবেদন, আরেকদিকে সাংবাদিক হিসেবে বাস্তবতাকে তুলে ধরার দায়বদ্ধতা – এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আমি যেন আজ এক কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি। তবুও, মিথ্যা সান্ত্বনার চেয়ে কঠিন বাস্তবতাকে মেনে নেওয়া অনেক বেশি জরুরি। কারণ জীবন থেমে থাকে না। শোককে শক্তিতে পরিণত করে আবার নতুন করে পথ চলতে হয়। প্রবাল কান্তির পরিবারও হয়তো একদিন এই কঠিন সত্যকে মেনে নেবে, কিন্তু আজ তাদের কান্না আর আকুতি বলে দিচ্ছে, তাদের হৃদয়ে যে ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়।
২০২০ সালের কোনো একদিন, কুয়েত প্রবাসী প্রবাল কান্তির মৃত্যু নিশ্চিত করতে আমাকে সহায়তা করেছিলেন কুয়েতে বাংলাদেশ দূতাবাসের সাবেক প্রতিরক্ষা অ্যাটাশে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবু নাছের।


আ হ জুবেদ (সম্পাদক, অগ্রদৃষ্টি)











