মরুভূমি পরিবেষ্টিত মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কুয়েতের শহরাঞ্চল থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরের নির্জন প্রান্তরে অবস্থিত ‘সালমি’ এলাকা। আপাতদৃষ্টিতে রুক্ষ মরুভূমি মনে হলেও জায়গাটি আসলে পুরো দেশের জন্য এক বিশাল অটোহাব বা অটোমোবাইল ভাঙারি বাজার। দুর্ঘটনায় দুমড়েমুচড়ে যাওয়া কিংবা কারিগরি জটিলতায় বিকল হয়ে পড়া গাড়িগুলো মেরামতের অযোগ্য ঘোষণা হলে সেগুলোর শেষ ঠিকানা হয় এই সালমি। এমনকি ২০২৬ সালের সর্বশেষ মডেলের নতুন গাড়ি কিংবা স্থানীয় প্রশাসন কর্তৃক বৈধতা হারানো কোনো যানবাহন হলেও তার স্থান মিলছে মরুভূমির এই গাড়ির কবরস্থানে। কিন্তু এই পরিত্যক্ত গাড়ির পাহাড় থেকেই তৈরি হয়েছে কোটি টাকার ব্যবসা, আর এর মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছেন প্রবাসী বাংলাদেশীরা।
প্রতিদিন কুয়েতের স্থানীয় নাগরিক থেকে শুরু করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রবাসীরা ভিড় করছেন এই সালমিতে, উদ্দেশ্য নিজেদের গাড়ির জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ খুঁজে নেওয়া। শহরের বড় বড় পার্টসের দোকান বা শোরুমের চড়া মূল্যের তুলনায় অত্যন্ত কম দামে আসল যন্ত্রাংশ মেলায় জমে উঠেছে এই সেকেন্ড হ্যান্ড যন্ত্রাংশের বাজার। আর এই ভাঙারি ও ব্যবহৃত পার্টস কেনাবেচার ব্যবসার একটি বিরাট অংশ দখল করে আছেন প্রবাসী বাংলাদেশী ব্যবসায়ীরা, যারা প্রতিকূল পরিবেশ জয় করে উপার্জনের নতুন দিশা খুঁজে পেয়েছেন।
দীর্ঘদিন ধরে সালমিতে স্ক্র্যাপ ও গাড়ির পার্টস ব্যবসার সাথে জড়িত ঢাকার ফারুক আহমদ। কাজের কঠোর বাস্তবতার কথা তুলে ধরে তিনি জানান, মরুভূমির চড়া রোদে গ্রীষ্মের চরম দাবদাহে এখানে কাজ করা প্রচণ্ড কঠিন। তবুও একটু বাড়তি উপার্জন আর ভালো থাকার আশায় কঠোর পরিশ্রম করে তারা সব কষ্ট সহ্য করে যাচ্ছেন। একই ধরনের অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করেন সিলেটের কামাল হোসেন। তিনি জানান, গত তিন বছর ধরে তিনি এই ব্যবসার সাথে যুক্ত। শহরের ধরাবাঁধা চাকরিতে থেকে এত টাকা আয় করা কোনোভাবেই সম্ভব হতো না, যা তিনি এই মরুপ্রান্তরের ভাঙারি বাজারে এসে উপার্জন করতে পেরেছেন।
ফেনী জেলার, কোম্পানিগঞ্জ উপজেলার রাশেদ ইরফান নামের আরেক প্রবাসী ব্যবসায়ী জানান, গাড়ির যেকোনো মডেল কিংবা ব্র্যান্ডের যন্ত্রাংশ এখানে পাওয়া যায়। শহরের দোকানে যেসব যন্ত্রাংশের দাম অতিরিক্ত কিংবা যা সহজে মিলছে না, সেগুলোর জন্য ক্রেতারা সোজা সালমিতে চলে আসেন। ব্যবসার পরিবেশ ভালো হলেও জীবনের কিছু কষ্টের কথা উল্লেখ করে রাশেদ বলেন, মরুভূমির এই সালমি এলাকায় রাতে থাকার কোনো সুযোগ নেই। সারাদিনের হাড়ভাঙা খাটুনি শেষে রাত যাপনের জন্য তাদের অনেক দূরের লোকালয়ে ফিরে যেতে হয়।
সালমির এই বিশাল অটোহাবের সুবিধা পাচ্ছেন সাধারণ গাড়ি মালিকরাও। এখান থেকে পার্টস কিনতে আসা মোহাম্মদ সেলিম হাওলাদার নামের এক ক্রেতা নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, শহরের একটা দোকান থেকে তার গাড়ির একটি পার্টসের দাম চাওয়া হয়েছিল ৬০ কুয়েতি দিনার। কিন্তু সালমির এই স্ক্র্যাপ মার্কেট থেকে তিনি হুবহু সেই প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশটি মাত্র ১০ দিনারে কিনে নিতে পেরেছেন। চড়া দামের বাজারে এই বিশাল সাশ্রয়ের কারণেই প্রতিদিন হাজারো ক্রেতা ছুটে আসেন মরুপ্রান্তরের এই সালমি বাজারে, আর সেই চাহিদাকে কেন্দ্র করেই কঠোর প্রবাস জীবনে হাসিমুখে কষ্টের পথ পেরিয়ে সফলতার গল্প লিখে যাচ্ছেন বাংলাদেশী প্রবাসীরা।
আ হ জুবেদ











