জগলুল হুদা, রাঙ্গুনিয়া : চট্টগ্রামের শস্যভান্ডার খ্যাত রাঙ্গুনিয়ার
গুমাইবিলের বোরো ধানের বাম্পার ফলন হলেও শ্রমিকের মজুরি বেশি হওয়ায়
কৃষকের মুখের হাসি নেই। চট্টগ্রামের বৃহৎ ২ হাজার ৬’শ হেক্টর আয়তনের
গুমাইবিলের চারপাশের ৬ ইউনিয়নের প্রায় অর্ধশতাধিক গ্রামের কৃষক
প্রতি বছর আবাদে অংশ নেয়। তবে এবার বোরো মৌসুমে বিগত বন্যার
ক্ষতির কারণে সঠিক সময়ে মাঠ প্রস্তুত করতে না পারায় মাত্র অর্ধেক জমিতে
চাষাবাদ হয়েছে। হেক্টর প্রতি উৎপাদন বিগত বারের চেয়ে বেশি হলেও
শ্রমিকের মজুরির কারণে কৃষকের চোখে-মুখে নেই আনন্দের ঝিলিক। তবে
উপজেলা কৃষি অফিস কৃষকদের ধান কর্তনে আধুনিক যন্ত্র ব্যবহারের
পরামর্শ দিচ্ছেন।
জানা যায়, চট্টগ্রাম-কাপ্তাই সড়কের বাম পাশে বিশাল এলাকার বিস্তৃর্ণ
কৃষিজমি গুমাই বিল নামে পরিচিত। বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিলগুলোর
মধ্যে এই বিলটি সবচেয়ে বড়। প্রবাদে আছে গুমাই বিলের উৎপাদিত মোট
ধান দেশের আড়াই দিনের খাদ্য চাহিদা মেটাতে পারে। সেই গুমাই বিলে
এবার বিগত বর্ষায় বন্যার কারণে বিশাল আয়তনের মাত্র অর্ধেক জমিতে
চাষাবাদ হয়েছে। এতে হেক্টর প্রতি বাম্পার ফলন হয়েছে। বিগত মৌসুমে
যেখানে হেক্টের প্রতি উৎপাদন ছিল ৫/৬ টন এবার তা বেড়ে দাড়িয়েছে ৭/৮
টনে।
সবচেয়ে বেশি ফলন হয়েছে ব্রি-২৮, ব্রি-২১ ও ব্রি-২৬ ধানের। ধানে
কুশি গড়ে ১৫টি, পুষ্ট দানা ১৬০ টি, ২.৫২ মিটার ব্যার্সাধে ধানরে ফলন
১০.৩৬০ কেজি। কিন্তু এবার উৎপাদনের সাথে সাথে শ্রমিকের মজুরিও
বেশি।
এতে বিপাকে পরেছে কৃষকরা। কারণ উৎপাদনের সাথে খরচের
সামঞ্জস্যতা মিলছে না।
বিগত ১মে গুমাইবিলের আশপাশের গ্রাম পরিদর্শনে দেখা যায়, বাম্পার ফলনের
পরেও কৃষকের চোখে-মুখে নেই আনন্দ। গুমাইবিলের ধান কাটার উৎসবের
সাথে বেড়েছে শ্রমিকদের কদর। উপজেলার রোয়াজারহাট, শান্তিরহাটে ৮’শত
টাকা মজুরীর নিচে কোন ধান কাটা শ্রমিক পাওয়া যায়নি। নেত্রকোনা,
ময়মনসিংহ, বাঁশখালি ও ফেনি থেকে আসা এসব শ্রমিক উত্তপ্ত গরমের
কারণে বেশি দাম হাঁকাচ্ছেন বলে কৃষকরা জানায়। অন্য বছরের তুলনায় এবার
উত্তরবঙ্গ থেকে ধান কাটা শ্রমিক এসেছে কম। ফলে অন্য এলাকা থেকে
আসা শ্রমিকের উপরই কৃষকদের নির্ভর করতে হচ্ছে। ফলে শ্রমিকদের অতিরিক্ত
মজুরি ও ধানের ন্যায্য মূল্য পাওয়া নিয়ে শংকিত কৃষকরা। বর্তমান বাজারে
আড়ি প্রতি (১০ কেজি) ধানের দাম ১২০ টাকা বলে কৃষকরা জানিয়েছেন।
সরকার বিদেশ থেকে অতিরিক্ত চাল আমদানি করার ফলে দেশে উৎপাদিত ধান
বিক্রি করেও খরচ উঠাতে পারছেন বলেও জানায় গুমাই বিলের চাষিরা। ন্যায্যা
মূল্যে সরকারি গুদামে ধান ক্রয় করার ব্যাপারে কিছু জানেন বলেও তারা জানায়।
এই ব্যাপারে উপজেলা খাদ্য গুদামের কর্মকর্তাদের ধান কিনার ব্যাপারে কোন
সঠিক তথ্য নেই কৃষি অফিসের কাছে।
চন্দ্রঘোনা-কদমতলী ইউনিয়নের কদমতলীর কৃষক মো. রেজাউল করিম জানায়,
প্রতিবছর ধান কাটার মৌসুমে বিভিন্ন এলাকা থেকে সহ¯্রাধিক
ধানকাটার শ্রমিক এখানে কাজ করতে আসে। মাত্র ৪৫দিনের ধান কাটার
একজন শ্রমিক থাকা, খাওয়া-দাওয়া নিয়ে দৈনিক ৮’শত টাকা হিসেবে ৪৫
হাজার টাকা আয় করে। চন্দ্রঘোনার অপর কৃষক মো. আবু তালেব জানায়,
সে এবার প্রায় ১২ কানি (৪৮০ শতক) জমি বর্গা নিয়ে চাষ করেছেন। তার
জমিত কানি প্রতি ৮০ আড়ি (৩২ মণ) করে ধান উৎপাদিত হয়েছে। বিজ,
সার, কীটনাশক এবং ধান কাটার শ্রমিকের দামসহ সব মিলিয়ে তার খরচ
হয়েছে ১১ হাজার টাকা। সারিতে চারা রোপনের কারণে তার উৎপাদন
বেড়েছে বলেও জানান তিনি।
একদিকে বাইরের চালে দেশ ভরপুর তার উপর আড়ি
প্রতি ধান মাত্র ১২০টাকা। যেখানে কানি প্রতি (৪০ শতক) জমিতে খরচ ১১
হাজার টাকা সেখানে নিজের ও পরিবারের পরিশ্রম বাদ দিলেও ধান বিক্রি করে
পাওয়া যাচ্ছে ১০ হাজার টাকারও কম। এই অবস্থায় ভবিষ্যতে চাষ থেকে বিরত
থাকা ছাড়া কোন উপায় নেই বলে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। একইভাবে
এবছর ২ কানি জমিতে ধান চাষ করেছে নিশ্চিন্তাপুরের কৃষক মো.
আনোয়ার। বাম্পার ফলন হওয়ায় সোনানি ধানের সোনালি ফসলে ভরে গেছে
তারা উঠান। চলছে ধান মাড়াই, খড়খুটো বাছাই ও রোদে শুকিয়ে গোলায়
ধান তোলার কাজের মহা ধুম।
কিন্তু এর পরেও তার মুখে হাসি নেই। একদিকে শ্রমিকের চড়া দাম অন্যদিকে ধানের দাম কম হওয়ায় তার মুখেও হতাশার চাপ।
বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে নেত্রকোনার দুর্গাপুর এলাকা থেকে আব্দুল আলী
ধান কাটার শ্রমিক হিসেবে রাঙ্গুনিয়া আসছেন। এবছরও তিনি ৭ দিন
হয় রাঙ্গুনিয়া এসেছেন। সে বলে, “প্রতি ধান কাটার মৌসুমে আমি
রাঙ্গুনিয়া এসে দেড় মাস ধান কাটার শ্রমিক হিসেবে কাজ করি। এতে
মালিকের ধান কাটতে গিয়ে থাকা-খাওয়া ছাড়াই দিন প্রতি ৮’শত টাকা
করে পেয়ে থাকেন”। ৩/৪ বছর আগে ৩’শ থেকে সাড়ে ৩’শত টাকায়
কাটলেও বছর দুয়েক হয় এই মজুরি বৃদ্ধি হয়েছে। তিব্র গরমে এই মজুরি
বেশি না বলেও তিনি দাবী করেন।
কৃষি অফিসের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. আলাউদ্দিন খোকন
জানায়, কৃষকদের ধান কাটা শ্রমিকের মজুরি নিয়ে চিন্তা থেকে মুক্তি
পেতে ধান কাটতে আধুনিক যন্ত্র ব্যবহার করতে পারেন। এসময় তিনি আরও
জানায়, গুমাই বিলে এই প্রথম পরীক্ষামূলকভাবে ধান কাটার যন্ত্র দিয়ে ধান
র্কতন করা হয়েছে। এই যন্ত্রটি রাউজানের পাহাড়তলি থেকে এনে
চন্দ্রঘোনার কৃষক মো. সরিাজুল ইসলামের জমিতে ধান কর্তন করা হয়।
গুমাই বিলে পরীক্ষামূলক এই যন্ত্রের ব্যবহারের ফলে কৃষকরে মাঝে ব্যাপক
আগ্রহের সৃষ্টি হয়েছে।
এসময় তিনি আরও জানায়, যেখানে ১ থেকে
দেড় কানি ধান কাটতে ৩/৪ জন শ্রমিকের সারাদিন লেগে যায়, সেখানে
ধান কাটার যন্ত্রের সাহায্যে মাত্র ১ ঘন্টায় ৫’শ টাকা খরচে একই পরিমাণ
ভূমির ধান কাটতে পারবে। এতে কৃষকরা লাভবান হতে পারে। বর্তমানে
ডি.এ.ই এর পক্ষ থেকে ৩০% ভূর্তকিতে এই যন্ত্র পাওয়া যাচ্ছে বলেও তিনি
জানায়।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কারিমা আক্তার জানায়, এবছর গুমাই বিলে প্রায়
২ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো চাষাবাদ হয়। প্রতি হেক্টরে এবার ধান হয়েছে
৭ টনেরও বেশি। এ হিসেবে এবছর গুমাই বিলে ১৭ হাজার মেট্রিক টন ধান
উৎপাদিত হয়েছে। যা থেকে চাল উৎপাদন হবে প্রায় ১০ হাহার মেট্রিক টন।
তবে এবছর গুমাই বিলে ধানের বাম্পার ফলন হলেও চড়া শ্রমিকের দামের কারণে
কৃষকরা হতাশ। তবে উপজেলা কৃষি অফিস কৃষকদের ভবিষ্যতে আধুনিক
যন্ত্রের সাহায্যে ধান কাটার পরামর্শ দিচ্ছে।











