
কুয়েতের মসজিদগুলোতে বাংলাদেশি প্রবাসীদের লুঙ্গি পরিহিত অবস্থায় দেখলে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে, এটি কি আসলেই বিদেশের কোনো মসজিদ, নাকি বাংলাদেশের কোনো প্রত্যন্ত অঞ্চলের? এমন দৃশ্য শুধু কুয়েতের স্থানীয়দের কাছেই নয়, অন্য দেশের প্রবাসীদের কাছেও বাংলাদেশের সংস্কৃতি এবং প্রবাসীদের ব্যক্তিত্ব নিয়ে ভুল ধারণা তৈরি করতে পারে। সম্প্রতি কুয়েতের সুয়েখ শিল্প এলাকার সাইদ ইয়াকুব, সাইদ ইউসুফ, এবং সাইদ আবদুল্লাহ রিফাই মসজিদে কিছু বাংলাদেশি প্রবাসীকে লুঙ্গি পরে নামাজ আদায় করতে দেখা গেছে। এই ঘটনা আবারও প্রবাসে পোশাকের গুরুত্ব নিয়ে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
পোশাক হলো একটি জাতির সংস্কৃতি এবং ব্যক্তিত্বের প্রথম পরিচয়। একজন ব্যক্তির পোশাক তার রুচি, সামাজিক অবস্থান, এবং শিক্ষাকে প্রতিফলিত করে। দেশের মান শুধু আর্থিক বা কূটনৈতিক সাফল্যের ওপর নির্ভর করে না, বরং এর নাগরিকদের আচরণ, ব্যক্তিত্ব এবং পোশাকের ওপরও অনেকাংশে নির্ভরশীল। পবিত্র স্থান যেমন মসজিদ, যেখানে মানুষ আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের জন্য একত্রিত হয়, সেখানে আরও বেশি পরিচ্ছন্ন ও মার্জিত পোশাক পরিধান করা উচিত। দুঃখজনক হলেও সত্য, অনেক বাংলাদেশি প্রবাসী কর্মক্ষেত্রে বা অন্যান্য কাজে ভালো পোশাক পরলেও মসজিদে আসেন লুঙ্গি পরে, যা খুবই বেমানান।
কুয়েতে লুঙ্গির ব্যবহার শুধু ঘরের ভেতরেই আরামদায়ক পোশাক হিসেবে গ্রহণযোগ্য। এর বাইরে, বিশেষ করে জনসমাগমস্থলে বা মসজিদে লুঙ্গি পরা স্থানীয় সংস্কৃতি ও সামাজিক রীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কুয়েতের স্থানীয় প্রশাসনও জনসমক্ষে লুঙ্গি পরিধানকে ভালো চোখে দেখে না এবং এর জন্য জবাবদিহি করার নজিরও রয়েছে। লুঙ্গি পরে বাইরে ঘোরাফেরা করা স্থানীয় নাগরিকদের কাছেও নেতিবাচক ধারণা তৈরি করে। এটি কেবল ব্যক্তির নিজস্ব সম্মানকেই ক্ষুণ্ন করে না, বরং সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
প্রতিবেদনে উল্লিখিত বাংলাদেশি প্রবাসীরা ন্যাশনাল কোম্পানি ও আব্দুল হামিদ কোম্পানির শ্রমিক এবং তাদের ব্যারাক মসজিদের পাশেই অবস্থিত। কর্মস্থল এবং বাসস্থান কাছাকাছি হওয়ায় অনেকেই তাড়াহুড়ো করে লুঙ্গি পরেই মসজিদে চলে আসেন। এই মানসিকতা পরিবর্তন করা অত্যন্ত জরুরি। প্রবাসে দেশের প্রতিনিধিত্ব করা প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব। নিজেদের ব্যক্তিত্বকে সমুন্নত রাখা এবং দেশের সম্মান অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য প্রবাসীদের আরও সচেতন হওয়া প্রয়োজন।
এই পরিস্থিতি শুধুমাত্র কুয়েতের নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশেই বাংলাদেশি প্রবাসীদের মধ্যে দেখা যায়। এই বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং শিক্ষা প্রদান এখন সময়ের দাবি। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ দূতাবাস, এবং প্রবাসে কর্মরত বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন এই বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। কর্মশালা, সেমিনার এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রবাসীদের পোশাকে শালীনতা ও ব্যক্তিত্বের গুরুত্ব সম্পর্কে শিক্ষিত করা সম্ভব।
সর্বোপরি, প্রবাসে থাকা প্রতিটি বাংলাদেশির মনে রাখা উচিত যে তারা কেবল নিজেদের প্রতিনিধিত্ব করছেন না, বরং গোটা বাংলাদেশের পরিচয় বহন করছেন। তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি আচরণ, এবং প্রতিটি পোশাকের মাধ্যমে দেশের সম্মান বৃদ্ধি বা হ্রাস হতে পারে। তাই, প্রবাসে নিজেদের এবং দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে পোশাকের প্রতি আরও যত্নবান হওয়া অপরিহার্য।

আ হ জুবেদ (সম্পাদক, অগ্রদৃষ্টি)











