সময়ের নিষ্ঠুর স্রোত অনেক কিছু কেড়ে নিলেও ম্লান করতে পারেনি প্রবাসের মাটিতে এক বাঙালি দম্পতির অমলিন ভালোবাসা আর শেকড়ের প্রতি টান। দীর্ঘ ৫৬ বছরের সংসার জীবনের পথচলা। বলছিলাম যুক্তরাজ্য প্রবাসী মৌলভীবাজারের কৃতি সন্তান, বিশিষ্ট সমাজসেবী মোহাম্মদ আব্দুল গনি ও তার সহধর্মিণীর কথা।
বার্ধক্যের ভারে শরীর নুয়ে পড়লেও, স্মৃতিশক্তি কিছুটা ফিকে হয়ে এলেও জীবনসঙ্গিনীর প্রতি তার মমত্ববোধ আর দেশের মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা আজও এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।
মৌলভীবাজার সদর উপজেলার ৫ নং আখাইলকুড়া ইউনিয়নের বেকামুড়া গ্রামের স্বনামধন্য তালুকদার পরিবারের সন্তান মোহাম্মদ আব্দুল গনি। চার যুগেরও বেশি সময় আগে জীবিকার তাগিদে পাড়ি জমিয়েছিলেন সুদূর বিলেতে। দীর্ঘ প্রবাস জীবনে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করলেও এক মুহূর্তের জন্যও ভুলে যাননি জন্মভূমির মাটির ঘ্রাণ।
বর্তমানে ৯০ ঊর্ধ্ব এই জ্যেষ্ঠ নাগরিক বার্ধক্যজনিত কারণে চলাফেরায় কিছুটা অক্ষম হলেও প্রতি বছরই সস্ত্রীক দেশে ছুটে আসেন আত্মীয়-স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশীদের সান্নিধ্যে। এমনকি এই বয়সেও তিনি তার উত্তরসূরিদের শিখিয়ে চলেছেন কীভাবে দেশের মানুষের পাশে দাঁড়াতে হয়, কীভাবে বজায় রাখতে হয় পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন।
আব্দুল গনি দম্পতির চার মেয়ে ও এক ছেলের সাজানো সংসার ছিল। তবে বিধাতার অমোঘ বিধানে ১৯৯৭ সালে লন্ডনে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় তাদের একমাত্র ছেলে অকালে প্রাণ হারান। একমাত্র পুত্রসন্তানকে হারানোর সেই গভীর ক্ষত বুকে চেপেই বড় করেছেন চার মেয়েকে। বর্তমানে তারা প্রত্যেকেই বৈবাহিক জীবনে প্রতিষ্ঠিত। বাবার আদর্শকে বুকে লালন করে বড় মেয়ে ফেরদৌসী উদ্দিন আজ বাংলাদেশে তাদের পরিবারের মান-মর্যাদার প্রতীক হয়ে উঠেছেন। কেবল নামেই নয়, নিজের কর্মে ও মানবিকতায় তিনি জয় করেছেন নিজ পরিবারের মানুষের মন। আত্মীয়-স্বজনের যেকোনো দু:সময়ে ফেরদৌসী উদ্দিনের হাত বাড়িয়ে দেওয়া এবং মানবিক কর্মকাণ্ড আজ তাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে, যার পেছনের মূল কারিগর তার পিতা আব্দুল গনি।
সম্প্রতি ঘরোয়া পরিবেশে যুক্তরাজ্যে উদযাপিত হলো এই গুণী দম্পতির ৫৬তম বিবাহবার্ষিকী। প্রিয়জনদের সান্নিধ্যে কেক কেটে আনন্দঘন মুহূর্তে তারা একে অপরের মুখ মিষ্টি করিয়ে দেন। এই বিশেষ মাহেন্দ্রক্ষণে বাংলাদেশে অবস্থানরত তাদের তালুকদার পরিবারের সদস্যরা এবং শুভাকাঙ্ক্ষীরা এই প্রবীণ দম্পতিকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। একই সাথে তাদের সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করেছেন এলাকাবাসী। আব্দুল গনি দম্পতির এই দীর্ঘ পথচলা যেন নতুন প্রজন্মের কাছে ধৈর্য, ভালোবাসা এবং শেকড়ের প্রতি দায়বদ্ধতার এক জীবন্ত পাঠশালা।
আ হ জুবেদ











