বাংলাদেশ এক অনন্য দেশ, যার জন্ম ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে জড়িয়ে আছে কোটি মানুষের আত্মত্যাগ আর দীর্ঘ সংগ্রামের গল্প। কিন্তু ৫৪ বছরের এই পথচলায় একটি বিষয় বারবার ফিরে এসেছে, ইতিহাসের সংজ্ঞায়ন নিয়ে বিভক্তি। বিশেষ করে স্বাধীনতার ঘোষক ও জাতির পিতা নিয়ে যে রাজনৈতিক দড়ি টানাটানি, তা যেন বাংলাদেশের ললাটে এক চিরস্থায়ী সংকটের তিলক হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজ যখন দেশবাসী পবিত্র ঈদুল ফিতরের আনন্দ উদযাপনে ব্যস্ত, তখন এই উৎসবের আমেজে একটি প্রশ্ন বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে— আমরা কি পারি না রাজনৈতিক মতভেদ ভুলে ইতিহাসের মৌলিক সত্যগুলোকে একীভূত করতে?
বাংলাদেশে গত কয়েক দশকে ক্ষমতার পালাবদলের সাথে সাথে ইতিহাসের বয়ানও পাল্টেছে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি, এই দুই প্রধান রাজনৈতিক দল যখনই ক্ষমতায় এসেছে, পাঠ্যবই থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় প্রচারণায় নিজেদের পছন্দসই ইতিহাসকেই একমাত্র সত্য হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। ফলে সাধারণ নাগরিকরা প্রায়শই বিভ্রান্ত হয়েছেন। অথচ নব্বইয়ের দশকে প্রখ্যাত কলামিস্ট আব্দুল গাফফার চৌধুরী একটি প্রস্তাব দিয়েছিলেন যা আজও প্রাসঙ্গিক। তিনি বলেছিলেন, বিবাদ মেটাতে আমরা যদি মেনে নিই যে, ‘বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেছেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান’ এবং ‘বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’, তবেই এই বিভক্তির দেয়াল ভাঙা সম্ভব।
ঐতিহাসিক তথ্যানুযায়ী, ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধুর প্রেরিত স্বাধীনতার ঘোষণাটি কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে ২৭শে মার্চ মেজর জিয়াউর রহমান পাঠ করেন। এই ঘোষণাটি ছিল দেশপ্রেমিক জনতা ও সেনাদের জন্য একটি বিশাল অনুপ্রেরণা। এখানে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব এবং জিয়াউর রহমানের সাহসিকতা, দুটিই মুদ্রার এ পিঠ ও ও পিঠ। বিশ্বজুড়ে যেখানে জাতির পিতা নির্বাচন করা হয় দীর্ঘ লড়াইয়ের নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তিকে, সেখানে শেখ মুজিবুর রহমানের অবদান ঐতিহাসিকভাবেই স্বীকৃত। অন্যদিকে, জিয়াউর রহমানের ঘোষণার ভূমিকাও অস্বীকার করার উপায় নেই।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, কোনো রাজনৈতিক দলই এই ‘উইন-উইন’ বা ভারসাম্যপূর্ণ ফর্মুলা গ্রহণ করেনি। যার ফলে আজও রাজপথে এই নিয়ে রক্তপাত এবং বাকবিতণ্ডা চলে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইতিহাস কোনো দলের ব্যক্তিগত সম্পদ নয়। এটি একটি জাতির পরিচয়। এই ঈদে যখন আমরা একে অপরের সাথে কোলাকুলি করি, তখন যদি আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বও ইতিহাসের সত্যগুলোকে সম্মান জানিয়ে একে অপরকে আলিঙ্গন করতে পারতেন, তবে বাংলাদেশ সত্যিই একটি সমৃদ্ধশালী ও ঐক্যবদ্ধ জাতিতে পরিণত হতো। সাধারণ মানুষের একটাই চাওয়া— ইতিহাসের এই অমীমাংসিত অধ্যায়গুলোর যেন একটি সম্মানজনক সমাপ্তি ঘটে, যাতে আগামী প্রজন্ম বিভ্রান্ত না হয়ে গর্বের সাথে মাথা উঁচু করে বলতে পারে, ‘আমরা একটি ঐক্যবদ্ধ জাতি’।
আ হ জুবেদ (সম্পাদক অগ্রদৃষ্টি)











