কৃতজ্ঞতা কেবল একটি স্লোগান নয়, বরং এটি মানুষের নৈতিকতা ও মূল্যবোধের প্রতিফলন। সময়ের দীর্ঘ ব্যবধানও যে অকৃত্রিম কৃতজ্ঞতাকে ম্লান করতে পারে না, আলজেরিয়ার গ্রাম্য এক বৃদ্ধের জীবনের এই সত্য ঘটনাটি তারই এক অনন্য দলিল।
ঘটনাটি ১৯৯৪ সালের। আলজেরিয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চলের সেই বৃদ্ধ জানালেন, “সে বছর আমার ১৪ বছর বয়সী মেয়েটি মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়ে। স্থানীয় চিকিৎসকরা তাকে রাজধানীর বড় হাসপাতালে স্থানান্তরের পরামর্শ দেন। সারাজীবন গ্রামে কাটানো আমার কাছে সেই বিশাল হাসপাতালটি ছিল গোলকধাঁধার মতো। অসুস্থ মেয়েকে নিয়ে সেখানে পৌঁছে আমি দিশেহারা হয়ে পড়ি। সাহায্য চাওয়ার মতো কাউকে পাচ্ছিলাম না। বার্ধক্যের ক্লান্তি, দীর্ঘ পথযাত্রার ধকল আর পকেটে টাকার অভাব—সব মিলিয়ে আমি ভেঙে পড়েছিলাম। একপর্যায়ে পার্কিং লটে বসে অঝোরে কাঁদতে শুরু করি, যাতে কেউ আমার চোখের পানি দেখতে না পায়।
ঠিক তখনই একটি বিলাসবহুল গাড়ি আমার সামনে এসে থামল। সাদা কোট পরা এক দীর্ঘদেহী যুবক গাড়ি থেকে নেমে আমার কাছে এলেন। পরম মমতায় জিজ্ঞেস করলেন, ‘চাচা, আপনার কী হয়েছে? কোনো সমস্যা?’ আমি কান্নায় এতটাই ভেঙে পড়েছিলাম যে কথা বলতে পারছিলাম না। তিনি আমার মেয়ের চিকিৎসার কাগজপত্র চাইলেন। আমার আইডি কার্ডটি হাতে নিয়ে তিনি গভীরভাবে আমাকে পর্যবেক্ষণ করলেন। তার চোখেমুখে বিস্ময় আর বিষণ্ণতা খেলা করছিল। হঠাৎ তিনি আমার কপালে চুমু খেয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন। আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘বাবা, তোমার কী হয়েছে?’ তিনি উত্তর দিলেন, ‘কিছু না চাচা, শুধু আপনাদের অবস্থা দেখে খারাপ লাগছে।’
এরপর সেই যুবক চিকিৎসক আমার মেয়েকে কোলে তুলে নিয়ে জরুরি বিভাগে ছুটলেন। হাসপাতালের সবাই তাকে অত্যন্ত সম্মানের চোখে দেখছিল। বুঝলাম তিনি এখানকার গুরুত্বপূর্ণ কেউ। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আমার মেয়ের সফল অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হলো। আমি কৃতজ্ঞতায় স্রষ্টাকে ধন্যবাদ জানালাম। তিন দিন পর হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পাওয়ার সময় সেই যুবক জেদ ধরলেন যে, মেয়েটি পুরোপুরি সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত আমাদের তার বাড়িতে থাকতে হবে। তার জোরাজুরিতে আমি রাজি হলাম। এক সপ্তাহ ধরে তিনি এবং তার পরিবার আমাদের যেভাবে সেবা করলেন, তা কেবল পরমাত্মীয়ের পক্ষেই সম্ভব।
সপ্তম রাতে খাওয়ার টেবিলে আমি স্থির হয়ে বসে রইলাম। বললাম, ‘বাবা, তুমি কে না জানা পর্যন্ত আমি এক লোকমা খাবারও মুখে তুলব না। কেন তুমি একজন অপরিচিত মানুষের জন্য এত কিছু করছ?’ যুবকটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিচু স্বরে বললেন, ‘চাচা, আপনার কি মনে আছে ১৯৬৪ সালের কথা? বাসে আপনার পেছনের সিটে বসা সেই কিশোরটির কথা, যাকে আপনি পাঁচ দিনার দিয়েছিলেন?’
স্মৃতি হাতড়ে আমার মনে পড়ল। হ্যাঁ, ৩০ বছর আগে বাসে করে শহরে যাওয়ার সময় দুই কিশোরের কথোপকথন শুনেছিলাম। খরা আর দারিদ্র্যের কারণে পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার কথা বলছিল তারা। তাদের সেই অসহায়ত্ব দেখে আমার খুব কষ্ট হয়েছিল। পকেট থেকে পাঁচ দিনার বের করে আমি একজনের হাতে দিয়ে বলেছিলাম, ‘বাবা, এই টাকাটা রাখো, তোমার স্কুলের খরচ হয়ে যাবে।’ সে নিতে না চাইলে আমি বলেছিলাম, ‘তোমার বাবাকে বলো এটা আমি দিয়েছি, তিনি আমাকে চেনেন।’
যুবকটি চোখের পানি মুছে বললেন, ‘চাচা, আমিই সেই কিশোর। আপনার দেওয়া সেই সামান্য পাঁচ দিনারই আমার পড়াশোনার পথ খুলে দিয়েছিল। আজ আমি আলজেরিয়ার এই বড় হাসপাতালের চিকিৎসক। আজ ৩০ বছর পর আল্লাহ আমাকে সুযোগ দিয়েছেন আপনার সেই ঋণের সামান্য অংশ শোধ করার। পৃথিবীর সমস্ত সম্পদ দিলেও আমি আজ ততটা খুশি হতাম না, যতটা আপনাকে সেবা করতে পেরে হয়েছি।’
আ হ জুবেদ -সম্পাদক অগ্রদৃষ্টি 











