দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ও রাজনৈতিক উত্তাপের মধ্য দিয়ে শেষ হওয়া ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। রাজধানী ঢাকার গুলশানে দলের রাজনৈতিক কার্যালয়ে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ প্রেস ব্রিফিংয়ে দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমের মুখোমুখি হন দলের নতুন কান্ডারি ও বিএনপির চেয়ারপারসন তারেক জিয়া। নির্বাচনে বিজয় নিশ্চিত হওয়ার পর এটিই ছিল তার প্রথম আনুষ্ঠানিক বক্তব্য, যেখানে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হয়ে দাঁড়ায় প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের সাথে আগামী দিনে বাংলাদেশের সম্পর্কের গতিপথ।
ব্রিফিংয়ে অংশ নেওয়া ভারতীয় গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা বারবার একটি প্রশ্নই ঘুরেফিরে করছিলেন—বিএনপি সরকার গঠন করার পর দিল্লির সাথে ঢাকার সম্পর্কের রসায়ন ঠিক কেমন হবে? উত্তরে তারেক জিয়া অত্যন্ত কৌশলী এবং দূরদর্শী অবস্থান গ্রহণ করেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, “একটি বন্ধুপ্রতিম ও নিকটতম প্রতিবেশী দেশের সাথে ন্যায়সঙ্গত এবং উন্নত সম্পর্ক বজায় রাখা আধুনিক কূটনীতির অপরিহার্য অংশ; আমাদের সম্পর্কও ঠিক তেমনই হবে—যেখানে দুই দেশের জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বের সম্মান হবে ভিত্তিপ্রস্তর।” তার এই ‘কৌশলী’ এবং ‘ভারসাম্যপূর্ণ’ বক্তব্য কেবল একটি রাজনৈতিক উত্তর ছিল না, বরং তা ছিল নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতির একটি প্রচ্ছন্ন সংকেত। তিনি ইঙ্গিত দেন যে, নতুন বাংলাদেশে সম্পর্ক হবে ‘ব্যক্তি বা দলকেন্দ্রিক’ নয়, বরং ‘রাষ্ট্র থেকে রাষ্ট্র’ পর্যায়ে, যেখানে ন্যায্যতা ও সমমর্যাদা প্রাধান্য পাবে।
একই সুর শোনা গেছে বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতাদের কণ্ঠেও। ডিপিটি ও আনন্দবাজারের মতো প্রভাবশালী গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের প্রশ্নের জবাবে দলের নীতি-নির্ধারকরা জানিয়েছেন যে, ট্রানজিট, কানেক্টিভিটি এবং পানিবণ্টনের মতো অমীমাংসিত ইস্যুগুলোতে বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থ সমুন্নত রেখেই দ্বিপাক্ষিক আলোচনা এগোবে। ভারতের সাথে কোনো বৈরিতা নয়, বরং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার স্বার্থে একযোগে কাজ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন তারা। তবে তারা এটিও মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, সীমান্তে হত্যা বন্ধ এবং তিস্তার পানি চুক্তির মতো বিষয়গুলো হবে সম্পর্কের গভীরতা মাপার লিটমাস টেস্ট। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তারেক জিয়ার এই ‘চাতুর্যপূর্ণ’ অথচ সম্মানজনক উত্তর বিশ্বমঞ্চে তার নেতৃত্বকে আরও পরিণত হিসেবে উপস্থাপন করেছে। দিল্লির সাউথ ব্লকের জন্য এটি একটি পরিষ্কার বার্তা—বাংলাদেশ বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিতে প্রস্তুত, তবে তা হতে হবে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও জাতীয় স্বার্থের সমীকরণে। ত্রয়োদশ সংসদের এই রায় কেবল দেশের অভ্যন্তরীণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্রে এক নতুন ভারসাম্য তৈরির পূর্বাভাস দিচ্ছে।
তারেক জিয়ার এবারের লক্ষ্য স্পষ্ট, তিনি একজন ‘জাতীয়তাবাদী নেতা’ হিসেবে নিজের ভাবমূর্তি বজায় রেখে আন্তর্জাতিক মহলে একজন ‘আধুনিক ও প্রগতিশীল রাষ্ট্রনায়ক’ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চান। তাঁর “চাতুর্যপূর্ণ” উত্তরগুলো প্রমাণ করে যে, তিনি আবেগের চেয়ে বাস্তববাদী কূটনীতিকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।

আ হ জুবেদ -সম্পাদক অগ্রদৃষ্টি











