চার পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের তৃতীয় পর্ব।
ক্যালেন্ডারের পাতায় ঘনিয়ে আসছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। আর এই নির্বাচনকে ঘিরে দেশের সীমানা ছাড়িয়ে প্রবাসের মাটিতেও বইছে উৎসবের আমেজ। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের আলোচনার মূল কেন্দ্রে এখন কেবলই নির্বাচন। কুয়েতের বাংলাদেশি অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে চায়ের কাপে ঝড় তুলছেন তারা, নিজেদের পছন্দের প্রার্থীর পক্ষে চলছে জোরালো প্রচার-প্রচারণা।
তবে এবারের নির্বাচনে বাড়তি আনন্দের কারণ প্রবাসীদের দীর্ঘদিনের এক বড় প্রাপ্তি। ইতিহাসের প্রথমবারের মতো রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে কুয়েত প্রবাসীদের ভাবনা ও চাওয়া-পাওয়া নিয়ে আ হ জুবেদের চার পর্বের বিশেষ ধারাবাহিক প্রতিবেদনের আজ থাকছে তৃতীয় পর্ব।
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হলো প্রবাসী রেমিট্যান্স, যার বড় একটি অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কুয়েত থেকে। বর্তমানে দেশটিতে অবস্থানরত প্রায় ৩ লক্ষাধিক বাংলাদেশি প্রবাসীদের কঠোর পরিশ্রম দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে শক্তিশালী রাখছে। তবে দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ঢেউ এবার আছড়ে পড়েছে কুয়েতের মরুভূমিতেও। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কুয়েত প্রবাসীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে অভূতপূর্ব উদ্দীপনা, যা গত কয়েক দশকের মধ্যে বিরল। এই নির্বাচনে প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা এবং তাদের নাগরিক অধিকারের সুরক্ষা এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।
এই নির্বাচনী ডামাডোলে প্রবাসীদের অধিকার আদায়ের জোরালো কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, কুয়েত শাখার যুগ্ম সম্পাদক মোহাম্মদ গোলাম সারোয়ার সিরাজী। এবং সাফা মারোয়া হজ্ব কাফেলার ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে পরিচিত এই প্রবাসী নেতা মনে করেন, নতুন বাংলাদেশে প্রথম নির্বাচনে প্রবাসীদের অংশগ্রহণ হবে গণতন্ত্রের জন্য এক বিশাল বিজয়। এক সাক্ষাৎকারে সারোয়ার সিরাজী বলেন, “প্রবাসীরা এতদিন শুধু টাকা পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রেখেছেন, কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদের মতামতের কোনো প্রতিফলন ছিল না।
আসছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রবাসীদের ভোট প্রদানের সুযোগ প্রদানের যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে একটি যুগান্তকারী এবং প্রশংসনীয় পদক্ষেপ। আমরা প্রত্যাশা করি, এবার প্রতিটি প্রবাসী তার নাগরিক অধিকার প্রয়োগের সমান সুযোগ পাবেন।”
নির্বাচনী ময়দানে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করে সারোয়ার সিরাজী নিজ দল ও আদর্শের পক্ষে সমর্থন কামনা করেন। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, আসন্ন নির্বাচনে ১১ দলীয় জোট যদি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পায়, তবে প্রবাসীদের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সমস্যার সমাধান হবে। বিশেষ করে বিমানবন্দরে হয়রানি বন্ধ, প্রবাসীদের জন্য বিশেষ পেনশন স্কিম এবং মরদেহ সরকারি খরচে দেশে নেওয়ার মতো বিষয়গুলো তাদের এজেন্ডায় অগ্রাধিকার পাবে। তিনি উল্লেখ করেন, প্রবাসীদের ঘাম ঝরানো অর্থের মর্যাদা রক্ষায় ১১ দলীয় জোট বদ্ধপরিকর।
কুয়েত প্রবাসী এই নেতার বক্তব্যে সবচেয়ে গুরুত্ব পেয়েছে প্রবাসীদের আইনি নিরাপত্তা। তিনি বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, “প্রবাসীদের অন্যতম প্রধান প্রাণের দাবি হলো ‘প্রবাসী সুরক্ষা আইন’ কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা। দেশে নিজেদের অনুপস্থিতিতে প্রবাসীদের স্থাবর সম্পত্তি ও জমি দখল হওয়া এখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক প্রবাসী সারা জীবনের সঞ্চয় দিয়ে কেনা জমি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন। শুধু তাই নয়, দেশে থাকা প্রবাসী পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আমরা এমন একটি সরকার চাই যারা প্রবাসী সুরক্ষা আইনকে কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না রেখে রাজপথে তার প্রতিফলন ঘটাবে।”
কুয়েতের বিভিন্ন বাংলাদেশি অধ্যুষিত এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, প্রবাসীরা এখন কেবল ভোটার হওয়ার অপেক্ষায় নেই, বরং তারা এমন এক নেতৃত্ব প্রত্যাশা করছেন যারা রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের প্রকৃত সম্মান প্রদান করবে। মোহাম্মদ গোলাম সারোয়ার সিরাজীর মতো প্রবাসী নেতাদের এই আহ্বান সাধারণ ভোটারদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে, যা আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এক বড় নিয়ামক হয়ে উঠতে পারে।












