কুয়েতের জিলিব আল সুয়েখ এলাকা,যেখানে প্রতিটি ইটের আড়ালে লুকিয়ে আছে হাজারো প্রবাসীর স্বপ্ন আর সেই স্বপ্ন ভঙ্গের হাহাকার। এখানকার জীর্ণ গ্যারেজ গলিতে পা রাখলেই চোখে পড়ে এক অদ্ভুত অস্থিরতা। কাজ চলছে পূর্ণোদ্যমে, কিন্তু কান পাতা থাকে সাইরেনের শব্দের দিকে। পুলিশের গাড়ির চাকার শব্দ পাওয়া মাত্রই শুরু হয় রুদ্ধশ্বাস দৌড়াদৌড়ি। এ যেন এক ইঁদুর-বেড়াল খেলা, যেখানে হারলেই নিশ্চিত নির্বাসন।
জিলিবের এই প্রাচীন গ্যারেজ গলি মূলত অবৈধ ব্যবসার এক বিশাল কেন্দ্রস্থল। ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা শত শত লাইসেন্সবিহীন গ্যারেজ এখন প্রশাসনের কঠোরতায় কিছুটা কমলেও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। এখানে কর্মরতদের সিংহভাগই বাংলাদেশি। অধিক অর্থ উপার্জনের নেশায় কিংবা দালালদের খপ্পরে পড়ে তারা লিপ্ত হচ্ছেন এমন সব কাজে, যার কোনো আইনি ভিত্তি নেই। বিশেষ করে গৃহকর্মী (আকামা ২০ নম্বর) ভিসাধারী প্রবাসীরা যখন বড় অংকের বেতনের আশায় এসব গ্যারেজে মেকানিক বা ক্লিনার হিসেবে কাজ করেন, তখন তারা মূলত নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল মারছেন। কুয়েতি আইনে ‘খাদেম’ ভিসায় এসে বাইরে কাজ করা বা লাইসেন্সহীন প্রতিষ্ঠানে শ্রম দেওয়া গুরুতর অপরাধ, যার একমাত্র শাস্তি জেল ও আজীবনের জন্য কুয়েত থেকে বহিষ্কার।
সরেজমিনে দেখা যায়, একটু আগেই যে কর্মীটি সহকর্মীদের সাথে হাসিমুখে গাড়ির যন্ত্রাংশ সারাচ্ছিলেন, পুলিশের ঝটিকা অভিযানে মুহূর্তেই তার হাতে হাতকড়া পড়ে যায়। অভিযানের পর কিছুক্ষণ এলাকাটি স্তব্ধ থাকলেও, পুলিশের গাড়ি চলে যাওয়ার পরপরই আবারও ‘যেই কি সেই’। গ্রেপ্তার এড়ানো বাকিরা পুনরায় আগের মতো কাজে ফিরে আসেন। প্রশাসনের এই কঠোর অবস্থানের মূল লক্ষ্য অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা। বর্তমানে জিলিবের হাতেগোনা মাত্র কয়েকটি গ্যারেজের বৈধ লাইসেন্স রয়েছে, বাকি সবই চলছে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে।
কমিউনিটি নেতৃবৃন্দ এবং অভিজ্ঞ প্রবাসীদের মতে, প্রবাসীদের এই আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত শুধু ব্যক্তির ক্ষতি নয়, বরং বিদেশের মাটিতে দেশের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ণ করছে। আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি এখন আগের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি। ফলে অবৈধভাবে কাজ করে সাময়িক লাভ হলেও শেষ পর্যন্ত বড় ধরনের আইনি জটিলতার ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে। নিরাপদ প্রবাস জীবনের স্বার্থে নিজ স্পন্সরের অধীনে থেকে বৈধভাবে কাজ করার কোনো বিকল্প নেই। জিলিবের এই গ্যারেজ গলির ‘ধরা-খাওয়ার সংস্কৃতি’ থেকে বের হয়ে না এলে, একদিন হয়তো শূন্য হাতেই অনেককে ফিরে যেতে হবে প্রিয় মাতৃভূমিতে।
আ হ জুবেদ -সম্পাদক অগ্রদৃষ্টি











