
এডিস এজেপ্টি নামে এক ধরনের স্ত্রী ডেঙ্গু মশার কামড়ে ডেঙ্গু জ্বর হয়। জীবাণুবাহী ডেঙ্গু মশা কামড় দেয়ার সাধারণত চার থেকে সাত দিন পরে ডেঙ্গু জ্বর হয়। ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত ব্যক্তিকে কোন জীবাণুবিহীন মশা কামড় দিলে, সেই জীবাণুবিহীন মশা ডেঙ্গু ভাইরাসে আক্রান্ত হয়। তখন সেই জীবাণুযুক্ত মশা যে কাউকে কামড় দিলে, সেই নতুন মানুষটি তখন ডেঙ্গু ভাইরাসে আক্রান্ত হয়। ডেঙ্গু জ্বর অধিকাংশ সময়ে সাত থেকে দশদিনের মধ্যে ভালো হয়ে যায়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে চার থেকে পাঁচ দিনেই মানুষ সুস্থ হয়ে ওঠে।
তবে গর্ভবতী নারীরা ডেঙ্গু ভাইরাসে আক্রান্ত হলে তা একই সাথে মা ও সন্তানের জন্য হয়ে ওঠে হুমকিস্বরূপ। ডেঙ্গু ভাইরাস মা থেকে গর্ভস্থ শিশুর দেহে সংক্রামিত হতে পারে বা জন্মের সময় ডেঙ্গু ভাইরাসে আক্রান্ত গর্ভবতী নারীর শিশুটির দেহে ডেঙ্গু
জ্বরের জীবাণু পৌঁছাতে পারে। তবে ডেঙ্গু জ্বর ছোয়াচে অসুখ নয়।
ডেঙ্গু জ্বরের উপসর্গ সমূহঃ
১। সাধারণত উচ্চ মাত্রার জ্বর, সারা দেহে হাড়ের মধ্যে ভয়ানক ব্যথা, মাথা ব্যথা, চোখের মণিতে ব্যথা থাকে। হাড়ের মধ্যে ভয়াবহ ব্যথার জন্য এই জ্বরের অপর নাম ব্রেক বোন ফিভার (হাড় ভাঙ্গুনী জ্বর )।
২। পেটে ব্যথা, এ্যাসিডিটি, বদহজম, বমি বমি ভাব, ডায়রিয়া হতে পারে। কারন ডেঙ্গু ভাইরাস রোধ প্রতিরোধ শক্তি কমিয়ে দেয়। গর্ভবতী নারী, শিশু, বৃদ্ধদেরকে অধিকাংশ সময়ে প্রাপ্ত বয়স্ক একজনের তুলনায় খুব বেশি দুর্বল করে দেয়।
৩। দাঁতের মাড়ি, নাক বা মলমূত্রের সাথে রক্ত যেতে পারে। জ্বর ছেড়ে যাবার পরে অনেকের দেহে ব্রণ এর মত লালচে র্যাশ বের হয়। যা খুব চুলকায়।
৪। অনেকের শ্বাসকষ্ট হয়। জ্বরের সাথে টনসিলের ইনফেকশন, কাশি, বুকে ব্যথা থাকে।
৫। খুব দুর্বল লাগে। এই জ্বরে শরীরে পানি শূণ্যতা তৈরী হয়। গর্ভবতী নারীদের হঠ্যাৎ প্রসাবের পরিমান কমতে পারে, প্রচন্ড পরিমানে মাথা ঘুড়ায়। এই ধরনের অবস্থায় গর্ভস্থ শিশু দুর্বল হয়ে যায়।
৬। গর্ভাবস্থায় প্রথম তিন মাসের মধ্যে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হলে অতিমাত্রায় বমি, কোষ্ট্যকাঠিন্য, ক্ষুধামন্দা, চোখে ঝাপসা লাগতে পারে। গর্ভস্থ শিশু সাড়ে চার মাস থেকে ডেলিভারীর আগে পর্যন্ত বাচ্চার নড়াচড়া কমতে পারে। হঠ্যাৎ খুব বেশি রক্তক্ষরণ হলে গর্ভস্থ শিশু মারা যেতে পারে। তবে ডেঙ্গু জ্বর হলেই গর্ভস্থ শিশু মারা যাবে, এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল।
৭। ডেঙ্গু জ্বরের পাশাপাশি নিউমোনিয়া, টনসিলে ইনফেকশন সহ বহুবিধ ইনফেকশন হতে পারে।
পরীক্ষাঃ
১। জ্বর হবার প্রথম দিনেই ডেঙ্গু এন এস ওয়ান এন্টিজেন, সিবিসি পরীক্ষা করাতে হবে। জ্বর চার/পাঁচদিনের বেশি হলে ডেঙ্গু টেস্ট নেগেটিভ আসতে পারে। কিন্তু প্লাটিলেট কমতে পারে। প্লাটিলেট হলো রক্তের জরুরী উপদান। এইজন্য নিয়মিত সিবিসি পরীক্ষা করাতে হবে।
সচেতনতাঃ
১। গর্ভস্থ নারীর রোগ প্রতিরোধ শক্তি অন্যদের তুলনায় কমে যায়। এই জন্য জ্বর হলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। জ¦র ও ব্যথা কমানোর জন্য প্যারাসিটামল ছাড়া অন্য কোনো ব্যথা নাশক ওষুধ খাওয়া যাবে না। এতে রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
২। গর্ভাবস্থার আগে বা পরে নির্নয় হওয়া কোনো অসুখ থাকলে, সে সব অসুখের চিকিৎসা করাতে হবে।
৩। প্রচুর পানি, তরল খাবার, হালকা টক ফল, ডাবের পানি ও ওরস্যালাইন নিয়মিত খেতে হবে। বাচ্চার নড়াচড়া খেয়াল করতে হবে।
৪। দিনে ও রাতে মশারির মধ্যে ঘুমাতে হবে। নিয়মিত পানি পান করার পরেও প্রসাবের মাত্রা কমে গেলে হসপিটালে ভর্তি হতে হবে।
৫। বাসা ও বাসার চারপাশে কোথাও কোনো পাত্রে পানি জমে থাকলে তা পরিস্কার করতে হবে। ডেঙ্গু মশা এধরনের পানিতে বাসা বাঁধে।
৬। পর্যাপ্ত বিশ্রাম, পুষ্টিকর খাবার খাওয়া ভীষণ জরুরী। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ধরনের এ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ খাওয়া এবং গর্ভবস্থায় রক্ত নেওয়া অনুচিত।
৭। অবস্থা খারাপ হলে অবশ্যই হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে।
ফরহানা মোবিন
চিকিৎসক, লেখক ও উপস্থাপিকা