ভোট মানেই পবিত্র আমানত, ভোট মানেই নাগরিক অধিকার,এই আপ্তবাক্যগুলো এখন কেবল পাঠ্যবইয়ের পাতায় কিংবা নির্বাচন কমিশনের দেয়ালে টাঙানো পোস্টারেই শোভা পায়। রূঢ় বাস্তবতা হচ্ছে, বাংলাদেশের নির্বাচনী সংস্কৃতিতে ‘ভোট’ এখন একটি পণ্য, যার বাজারমূল্য নির্ধারিত হয় প্রার্থীর সামর্থ্য আর ভোটারের চাহিদার ওপর ভিত্তি করে।
তবে এবারের চিত্রটা ভিন্ন। আগে যেখানে কেবল দিনমজুর বা নিম্নবিত্ত মানুষের অভাবকে পুঁজি করে ভোট কেনা হতো, এখন সেই ‘হাটে’ ভিড় বেড়েছে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ও অভিজাত উচ্চবিত্তের। নৈতিকতার স্খলন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ভোট বিক্রি এখন আর কোনো অপরাধ বা পাপ নয়, বরং অনেকের কাছে এটি নির্বাচনের মৌসুমী ‘উপরি পাওনা’।
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, দক্ষিণ এশিয়ায় ভোট কেনাবেচার সংস্কৃতি কয়েক দশকের পুরনো। ব্রিটিশ আমলের জমিদারী প্রথা থেকে শুরু করে পাকিস্তান আমলের মৌলিক গণতন্ত্র সবখানেই প্রভাবশালীদের মাধ্যমে ভোট নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা ছিল। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে এসে এই প্রক্রিয়া ডিজিটাল ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (TIB) সহ বিভিন্ন সুশীল সমাজের গবেষণায় উঠে এসেছে যে, নির্বাচনের আগে ‘পকেট খরচ’, ‘চা-নাস্তার বিল’ কিংবা ‘উন্নয়ন অনুদান’-এর নামে ভোটারদের তুষ্ট করা এখন ওপেন সিক্রেট। আগে যেখানে কেবল একবেলা আহার বা কয়েকশ টাকার বিনিময়ে নিম্নবিত্তের ভোট মিলত, এখন মধ্যবিত্ত পাড়ায় সিসিটিভি ক্যামেরা বসিয়ে দেওয়া, ক্লাবের জন্য এসি কেনা কিংবা উচ্চবিত্ত সোসাইটির গেট সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ব্লকে ব্লকে ভোট কেনা হচ্ছে।
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, এই নৈতিক বিপর্যয়ের মূলে রয়েছে বিচারহীনতা এবং রাজনীতির বাণিজ্যিকীকরণ। যখন একজন জনপ্রতিনিধি কোটি কোটি টাকা খরচ করে মনোনয়ন কেনেন, তখন তিনি সেটিকে ‘বিনিয়োগ’ হিসেবে দেখেন এবং সেই বিনিয়োগের লভ্যাংশ তুলতে ভোটারদেরও অর্থের লোভ দেখান। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই লেনদেন এখন আর গোপনে হয় না। ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধের দোহাই দিয়ে একসময় যা ঘৃণিত ছিল, এখন তা ‘উপহার’ হিসেবে স্বীকৃত। অনেক ভোটার মনে করেন, “নেতারা তো কোটি কোটি টাকা লুট করছে, সেখান থেকে ৫০০ বা ১০০০ টাকা নিলে ক্ষতি কী?” এই বিপজ্জনক মানসিকতা কেবল গণতন্ত্রকে পঙ্গু করছে না, বরং সৎ ও যোগ্য প্রার্থীদের নির্বাচনী দৌড় থেকে ছিটকে ফেলে দিচ্ছে।
আন্তর্জাতিক মাধ্যম যেমন ‘দ্য ইকোনমিস্ট’ বা ‘বিবিসি’ বিভিন্ন সময় তাদের প্রতিবেদনে দেখিয়েছে যে, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে অর্থই হচ্ছে ক্ষমতার মূল চাবিকাঠি, যেখানে আদর্শ কেবল একটি মুখোশ মাত্র।
এই সংস্কৃতি বন্ধ না হলে ভবিষ্যতে জননেতা নয়, বরং ‘জন-ক্রেতা’ তৈরি হবে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর উদাসীনতা এবং নির্বাচন কমিশনের নখদন্তহীন অবস্থান এই সংস্কৃতিকে আরও উসকে দিচ্ছে। যদি উচ্চবিত্ত ও শিক্ষিত সমাজও অর্থের বিনিময়ে নিজেদের নাগরিক অধিকার বিসর্জন দেয়, তবে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। কারণ, যে ভোট কেনা হয় টাকার জোরে, সেই ভোটের কাছে দায়বদ্ধতা থাকে কেবল টাকার মালিকের, সাধারণ জনগণের নয়।

আ হ জুবেদ, সম্পাদক (অগ্রদৃষ্টি)











