ধর্ম ও নৈতিকতা কেবল আনুষ্ঠানিক ইবাদতের নাম নয়, বরং এটি মানুষের আচরণ এবং লেনদেনের স্বচ্ছতার এক পরম প্রতিফলন। বর্তমান সমাজে আমরা প্রায়ই একটি বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হই— যেখানে বাহ্যিক ধার্মিকতা আর অভ্যন্তরীণ নৈতিকতার মধ্যে আকাশ-পাতাল ব্যবধান লক্ষ করা যায়। অথচ আধ্যাত্মিক দর্শনের মূল কথা হলো, স্রষ্টা মানুষের পোশাক বা অবয়ব দেখেন না, তিনি দেখেন হৃদয়ের পবিত্রতা এবং কর্মের শুদ্ধতা।
এক গভীর সামাজিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, সমাজের এক প্রান্তে এক নারী রয়েছেন যাকে পৃথিবী ‘পতিত’ বা ঘৃণিত হিসেবে চেনে। জীবিকার তাগিদে তিনি দেহব্যবসায় লিপ্ত, যা নৈতিক ও ধর্মীয়ভাবে চরম গর্হিত। কিন্তু বিস্ময়কর হলো, অন্ধকার গলির সেই হাড়ভাঙা খাটুনির অর্থ নিয়ে ঘরে ফেরার পথে তিনি যখন ক্ষুধার্ত প্রতিবেশীর অন্নের ব্যবস্থা করেন, তখন সেই ‘পূণ্য কর্ম’ মানবিকতার এক অনন্য উচ্চতা স্পর্শ করে। অনেক সময় দেখা যায়, এই একনিষ্ঠ মানবিকতা এবং নিঃস্বার্থ সেবা স্রষ্টার কাছে এতটাই দামী হয়ে ওঠে যে, তা তার অতীতের সব পাপ মোচনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এটিই হচ্ছে ‘নিয়ামত’ বা শুদ্ধ নিয়তের শক্তি, যেখানে স্রষ্টা বান্দার খাসলত ও আর্তমানবতার সেবাকেই অধিক মূল্যায়ন করেন।
এর ঠিক বিপরীত চিত্রটি আরও ভয়াবহ। সমাজের অন্য প্রান্তে এমন এক শ্রেণির দেখা মেলে যারা স্রষ্টার প্রতিটি নির্দেশ— নামাজ, রোজা কিংবা ধর্মীয় পোশাক— অক্ষরে অক্ষরে পালন করছেন। অথচ তাদের উপার্জনের প্রতিটি কণা সুদ, ঘুষ আর সাধারণ মানুষের রক্তচোষা অর্থে গঠিত। ধর্মীয় শাস্ত্র অনুযায়ী, সুদের ব্যবসা স্রষ্টার বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণার শামিল। যখন কেউ কপালে সিজদার চিহ্ন রেখে অন্য হাতে দুর্নীতির অর্থ পকেটে পুরে, তখন তার সেই ইবাদত স্রেফ একটি যান্ত্রিক মহড়ায় পরিণত হয়। এমন কপট ধার্মিকতা স্রষ্টাকে খুশি করতে পারে না, কারণ অন্যের অধিকার (হক্কুল ইবাদ) নষ্টকারীর জন্য ক্ষমা অত্যন্ত কঠিন।
প্রকৃতপক্ষে, ধর্ম মানুষকে পরিশুদ্ধ করার জন্য এসেছে, পাপ ঢাকার ঢাল হিসেবে নয়। যারা দিনের আলোয় জিকির করেন আর রাতের আঁধারে দুর্নীতির জাল বোনেন, তাদের চেয়ে সেই পাপিষ্ঠও উত্তম যার অন্তরে অন্তত মানুষের প্রতি দয়া আছে। পৃথিবীর অনেক বড় বড় চিন্তাবিদ ও কলামিস্টদের মতে, যে ইবাদত মানুষকে সৎ ও বিনয়ী করতে পারে না, তা অর্থহীন। স্রষ্টার ভালোবাসা পাওয়ার সংক্ষিপ্ততম পথ হলো তাঁর সৃষ্টির সেবা করা। তাই উপার্জনে সততা আর মানুষের প্রতি ভালোবাসা— এই দুইয়ের সমন্বয় ছাড়া জান্নাত বা স্রষ্টার প্রিয় হওয়া অসম্ভব। শেষ বিচারে মানুষের কপালে সিজদার কালো দাগ নয়, বরং তার হাতের উপার্জনের উৎস এবং হৃদয়ের মমতাই হবে পরম বিচার্য।

আ হ জুবেদ (সাংবাদিক ও কলামিস্ট)











